শ্বাগুফ্টা নেমাত
সৌদি আরবে হজ যাত্রার সময় প্রচণ্ড গরমের প্রকোপ একটি গুরুতর চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। কয়েক বছর আগে বার্ষিক হজের সময় অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে বহু হাজির মৃত্যু হয়েছিল। তবে সম্প্রতি এই ঝুঁকিগুলোর মোকাবিলার জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে সৌদি আরবের জাতীয় বিমান পরিবহণ সংস্থা ‘সৌদিয়া এয়ারলাইন্স’ (Saudia Airlines) গরম ও শীত থেকে সুরক্ষা দিতে এক বিশেষ ধরনের উচ্চ-প্রযুক্তির ইহরাম (Ihram) তৈরি করেছে।
সৌদিয়া এয়ারলাইন্স হজযাত্রীদের সুবিধার জন্য ‘শীতল ইহরাম’ (The Coolest Ihram) উন্মোচন করেছে, যা হজ ও ওমরাহর সময় পরিধানযোগ্য এক যুগান্তকারী, উন্নত প্রযুক্তির পোশাক। অতিরিক্ত তাপমাত্রার সময় শরীরকে ঠান্ডা রাখার জন্যই এটি বিশেষভাবে ডিজাইন করা হয়েছে।
একজন হজযাত্রীর ছবি
‘শীতল ইহরাম’ কী?
বাহ্যিকভাবে ‘শীতল ইহরাম’ দেখতে একেবারেই প্রচলিত ইহরামের মতো। ধর্মীয় নিয়ম অনুযায়ী এটির রং সাদা, সরল এবং সাদামাটা। তবে আসল নতুনত্ব লুকিয়ে আছে এর কাপড়ের ভেতরে। ব্র্যান্ডিং ফার্ম লেন্ডার এবং কুলিং ফ্যাব্রিক বিশেষজ্ঞ ব্ৰার (brrr)-এর সহযোগিতায় তৈরি এই উদ্ভাবনী পোশাক ইসলামিক হজপোশাকে প্রথম বড় প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এই শীতলীকরণ পদ্ধতি কীভাবে কাজ করে?
‘শীতল ইহরাম’-এর কাপড় তিনটি মূল নীতির ওপর কাজ করে:
১) শীতল প্রভাব: এতে পেটেন্টকৃত শীতলীকরণ খনিজ পদার্থ রয়েছে, যা পরিবেশের তাপমাত্রার উপর নির্ভর করে ত্বকের তাপমাত্রা ১–২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কমাতে পারে। ফলে শরীরে ব্যক্তিগত শীতলতার অনুভূতি তৈরি হয়।
২) আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ: এটি ঘাম শুষে নিয়ে দ্রুত বাষ্পীভবন ঘটায়, ফলে শরীর স্বাভাবিকভাবে ঠান্ডা থাকে।
৩) দ্রুত শুকানো: এই ফ্যাব্রিক খুব দ্রুত শুকিয়ে যায়। ঘামের সংস্পর্শে এলেও অল্প সময়েই শুকিয়ে যায়, ফলে যাত্রীদের আর্দ্রতা বা অস্বস্তি অনুভব করতে হয় না।
এই কাপড় UPF ৫০+ সূর্যরশ্মির ক্ষতিকর প্রভাব থেকেও সুরক্ষা দেয়। পাশাপাশি এটি পুরুষ ও নারী উভয়ের জন্য ইহরামের ধর্মীয় প্রয়োজনীয়তা সম্পূর্ণ রূপে বজায় রাখে।
এই উদ্ভাবনের তাৎপর্য
হজ ও ওমরা কেবল শারীরিক যাত্রা নয়, এটি ভক্তি, আশা এবং ধৈর্যে ভরা এক আধ্যাত্মিক পথচলা। প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষ তাদের আধ্যাত্মিক স্বপ্ন পূরণে সৌদি আরবের পথে যাত্রা করে। কিন্তু তাদের অনেককেই প্রচণ্ড গরমের মতো বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়।
পুরুষ-মহিলা উভয় হজ যাত্রীর জন্য ইহরাম
প্রতি বছর নির্দিষ্ট সময়ে হজের তাপমাত্রা বাড়তে থাকে। বিশেষ করে বয়স্ক ও অসুস্থ হাজিদের জন্য হিটস্ট্রোক ও হিট স্ট্রেস বড় শারীরিক ঝুঁকি তৈরি করে। এমনকি সুস্থ ব্যক্তিরাও দীর্ঘ সময় হাঁটা, দাঁড়িয়ে থাকা এবং চলাফেরার কারণে ডিহাইড্রেশন ও প্রচণ্ড ক্লান্তিতে ভোগে।
সৌদিয়া এয়ারলাইন্সের বিপণন বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট এসসাম আখুনবেহ বলেন, “এই উদ্ভাবন হজযাত্রীদের অভিজ্ঞতা উন্নত করার আমাদের অঙ্গীকারকে তুলে ধরে। আমাদের লক্ষ্য তাদের যাত্রায় আরাম নিশ্চিত করা, যাতে তারা সত্যিকার অর্থে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর উপর মনোযোগ দিতে পারেন।”
মানবকেন্দ্রিক পদক্ষেপ
শীতল কাপড়, শুনতে সাধারণ মনে হতে পারে। কিন্তু একজন হজযাত্রীর জন্য এটি সংগ্রাম ও স্বস্তির মধ্যে পার্থক্য তৈরি করতে পারে। এতে গরমের ঝুঁকি কমে ও মানুষ উপাসনায় মনোনিবেশ করতে পারে।
‘শীতল ইহরাম’-এর প্রকৃত মূল্য বোঝা যায় যখন কেউ এটি পরিধান করে। কল্পনা করুন, একজন বৃদ্ধ হাজি ধীরে ধীরে তাওয়াফ করছেন, নামাজ পড়ছেন। তার জন্য এই শীতল ফ্যাব্রিক যেন একটি কোমল সমর্থন, যা তাকে মুহূর্তটির আধ্যাত্মিক তাৎপর্যে সম্পূর্ণ মনোনিবেশ করতে সাহায্য করে।
পরম্পরা ও সরলতার প্রতি সম্মান
‘শীতল ইহরাম’ তৈরি করতে গিয়ে ডিজাইনাররা নিশ্চিত করেছেন, ধর্মীয় সরলতা নষ্ট না হয়। তাই কোনো অতিরিক্ত অলংকার বা ডিজাইন যোগ করা হয়নি। এর সব উন্নত প্রযুক্তি লুকিয়ে আছে এর সূক্ষ্ম আঁশের ভিতরে, আর বাহ্যিক রূপ একেবারেই প্রচলিত ইহরামের মতো।
উচ্চ-প্রযুক্তির ইহরাম
এই প্রতিশ্রুতি হাজিদের আশ্বস্ত করছে যে তাদের ধর্মীয় পরম্পরা অক্ষুণ্ণ থাকবে। পোশাকটি বিভিন্ন প্রদর্শনীতে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং যাত্রা ও হজ পরিষেবা প্রদানকারীরা এটি প্রদর্শন করছেন। কিছু হজ কিট ও ভ্রমণ পরিকল্পনার মধ্যেও এটি অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে, যাতে সবাই সহজে এটি পেতে পারে।
সমষ্টিগত দায়িত্ব ও ভবিষ্যতের লক্ষ্য
‘শীতল ইহরাম’ নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ, তবে এটি হজযাত্রীদের নিরাপত্তার বৃহত্তর ব্যবস্থার একটি অংশমাত্র। পানি পান, ছায়াযুক্ত পথ, নিয়মিত বিশ্রাম, চিকিৎসা সহায়তা, এসবই অত্যন্ত জরুরি। নতুন এই ইহরাম কেবল সুরক্ষা ও আরামের একটি অতিরিক্ত স্তর যোগ করছে।
ভবিষ্যতে লক্ষ্য হলো, এটিকে সব ধরনের পটভূমির হজযাত্রীর জন্য আরও সহজলভ্য করা। অনেকেই সারা জীবনের সঞ্চয় খরচ করে হজে যান। তাই ভ্রমণ সংস্থা ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলো মৌলিক হজ কিটে শীতল কাপড় অন্তর্ভুক্ত করার উপায় খুঁজছে, যাতে বিশেষ করে বয়স্ক ও দুর্বল তীর্থযাত্রীরা সমানভাবে উপকৃত হন।
এই উদ্ভাবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, উদ্ভাবন সবসময় জাঁকজমকপূর্ণ হতে হবে না। কখনও কখনও শান্ত, মনোযোগী ধারণাগুলোই সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। মানুষের জীবনের অন্যতম আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার সময় আরাম নিশ্চিত করে সৌদি আরব এক অত্যন্ত মানবিক পদক্ষেপ নিয়েছে, যা পরম্পরার প্রতি সম্মান এবং প্রত্যেক হাজির কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেয়।