শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ
মালদহ:
অন্যায়ের চাপে সমাজচ্যুত—তবু মানবতার সামনে সেই দেওয়াল ভেঙে পড়ল মুহূর্তেই। মালদহের হরিশ্চন্দ্রপুরের কুশিদা গ্রাম পঞ্চায়েতের মুকুন্দপুর গ্রামে মঙ্গলবার দেখা গেল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল নজির। জমি-বিবাদকে কেন্দ্র করে গ্রামের মাতব্বরদের নির্দেশে দীর্ঘদিন ধরে ‘একঘরে’ থাকা একটি পরিবারের শেষ সংকটে পাশে দাঁড়ালেন পাশের গ্রামের মুসলিম যুবকেরা। তাঁদের কাঁধেই শেষযাত্রায় পাড়ি দিলেন সিভিক ভলান্টিয়ারের বাবা, টুপন দাস।
অভিযোগ, টুপন দাসের বাড়ির সামনে থাকা খাস জমি দখলকে কেন্দ্র করে গ্রামেই কয়েকজনের সঙ্গে তাঁর বিবাদ চলছিল দীর্ঘদিন। সেই বিবাদ থেকেই তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে সমাজচ্যুত করে দেওয়া হয়। সিভিক ভলান্টিয়ার কিশোর দাস বহুবার থানায়, মহকুমা প্রশাসনে এবং জেলা প্রশাসনে অভিযোগ জানালেও সুরাহা হয়নি। উল্টে স্থানীয় কিছু মাতব্বরের নির্দেশে তাঁদের সঙ্গে কথাবার্তা বন্ধ করে দেয় প্রতিবেশীদের বড় অংশ। সমাজচ্যুত অবস্থায় ক্রমশ অসুস্থ হয়ে পড়েন টুপনবাবু। মঙ্গলবার তাঁর মৃত্যু হলে ঘটে চূড়ান্ত বিপত্তি—শেষকৃত্যে কাঁধ দিতে কেউ এগিয়ে এলেন না।
শোকের মুহূর্তে পরিবার বিপর্যস্ত। কিন্তু ঠিক তখনই সামনে আসে মানবতার আলো। প্রতিবেশী গ্রাম থেকে কয়েকজন মুসলিম যুবক খবর পেয়ে ছুটে আসেন টুপনবাবুর বাড়িতে। ধর্মের ভিন্নতা, সামাজিক প্রথার দেওয়াল—কিছুই বাধা হয়ে ওঠেনি। তাঁরা নিজেরাই কাঁধে নেন মৃতদেহ, নিয়ে যান শ্মশানে এবং সম্পূর্ণ মর্যাদার সঙ্গে শেষকৃত্য সম্পন্ন করেন।
মুকুন্দপুর ও আশপাশের এলাকায় এই দৃশ্য মুহূর্তে আলোড়ন তোলে। যখন গ্রামের ভিতরে বিবাদ আর দোষারোপে মানবিকতা লোপ পাচ্ছিল, তখন পাশের গ্রামের মুসলিম যুবকদের এই পদক্ষেপ নতুন করে বিশ্বাস জাগাল—মানুষের পাশে মানুষই দাঁড়ায়। কিশোর দাস আবেগাপ্লুত কণ্ঠে জানান, “যে সময়টায় সবচেয়ে বেশি দরকার ছিল পাশে থাকার, তখন আমাদের নিজের গ্রামই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু অন্য গ্রামের ছেলেরা এসে যেভাবে বাবার শেষযাত্রা সম্পন্ন করল, সেটা জীবনে ভোলার নয়। ধর্ম নয়—মানবতাই শেষ কথা।”
ঘটনার পর থেকেই প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পরিবারটির অভিযোগ, দখলদারি ও হামলার অভিযোগ জানালেও কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্টে তাঁদের উপরই সামাজিক চাপ বাড়তে থাকে। তবে মানুষের প্রতি মানুষের এই নিঃস্বার্থ পাশে দাঁড়ানো মুহূর্তটিকে ছাপিয়ে যায় সব আক্ষেপ।
মুকুন্দপুরের মঙ্গলবারের ঘটনাটি শুধু একটি শোকযাত্রার গল্প নয়, বরং সেই অদৃশ্য সোনালি সুতোয় বাঁধা একতার কথা—যেখানে ধর্ম, জাতপাত, মতভেদ সবকিছুই ম্লান হয়ে যায়। মানবতার এই ছবি আবারও মনে করিয়ে দেয়, সংকটের সময় বিভাজন নয়, সম্প্রীতিই হতে পারে সমাজের আসল পরিচয়।