শান্তিপ্রিয় রায়চৌধুরী
ব্রিটিশ শাসনামলে মেঘনাথ সাহা ভারতবর্ষ তথা সারা বিশ্বে একজন খ্যাতিমান পদার্থবিদ হিসেবে সমাদৃত হয়েছিলেন। ১৯২০র দশকে তিনি নক্ষত্রের বর্ণালী বিশ্লেষণে তাপীয় আয়নীকরন তত্ত্বে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন। ভারতের স্বাধীনতার পূর্বে ও পরে আমৃত্যু তিনি বিজ্ঞানের জন্য এবং বিজ্ঞানমনস্কতা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য নিরন্তন কাজ করে গেছেন। তার জীবনী আমাদের উৎসাহিত করবে নানাভাবে। প্রথমত, তিনি বাংলাদেশের এক অজপাড়া- গ্রামের দরিদ্র ও নিম্ন বর্ণের হিন্দু পরিবারে ১৮৯৩ সালের ৬ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন। নানা প্রতিকূলতার বাধা পেরিয়ে বিজ্ঞানের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেছিলেন তিনি। দ্বিতীয়ত, তিনি কেবল একজন বিনম্র পড়ুয়া-মানুষই ছিলেন না, তিনি ভারতের স্বাধীনতার জন্য ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র বিপ্লবে জড়িয়ে ছিলেন যে আন্দোলনের ফসল হিসেবে ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতা অর্জিত হয়।
প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ার সময় মেঘনা সাহা বিপ্লবী স্বদেশী আন্দোলনকারী নেতৃত্ববৃন্দের সংস্পর্শে আসেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও শৈলেন ঘোষ। অবশ্য বিপ্লবীদের গুপ্ত আন্দোলন পন্থার কারণে ইতিহাসবিদগনের পক্ষে মেঘনাথ সাহার বিপ্লবী আন্দোলনের বিস্তারিত জানা কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। সেই সময় বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের স্বাধীনতা আন্দোলনে তৎকালীন আইরিশ রিভোলিউসনারি সিন ফেইন পার্টির স্বাধীনতা আন্দোলনে অনুপ্রেরণা জুগিয়ে ছিল। সিন ফেইন বাঙ্গালিদের মধ্যে আলোড়ন তুলেছিল, কারণ শত্রুপক্ষ ছিল একই- ব্রিটিশ, যারা এই দুই জাতির মধ্যেই দীর্ঘদিন ধরে উপনিবেশ কায়েম করে রেখেছিল। সেই সময় জার্মানির সহায়তায় আইরিস ন্যাশনালিস্ট পার্টির আন্দোলন নানা দিক থেকেই উপমহাদেশীয় গান্ধীবাদী আন্দোলনের সঙ্গে তুলনীয় ছিল। মেঘনাথ সাহা এই ধরনেরই সংগঠন অনুশীলন সমিতি এবং যুগান্তরের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। বিপ্লবী গোষ্ঠীতে যোগ দিয়ে বাঘাযতীন এবং পুলিন দাসের মতো নেতার সংস্পর্শে এসে তরুণ মেঘনাথ সাহা সশস্ত্র প্রতিরোধে উৎসাহী হয়ে ওঠেন। এবং এর ফলে ব্রিটিশ নানাবিধ চাপে তার জীবন ওষ্টাগত হয়ে যায়। একটি ঔপনিবেশিক শাসনের মধ্যে একজন পদার্থবিদের এ ধরনের বিপ্লবের সঙ্গে জড়িয়ে যাওয়া খুবই বিরল ঘটনা।
১৯১৯ সালটা শুধু মেঘনাথ সাহার বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং এ বছরটি ভারতীয় মুক্তিকামী আন্দোলনের জন্য ও একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর। এই বছরের ১৩ এপ্রিল পাঞ্জাবের অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগে একটি নৃশংস ঘটনা ঘটে। ব্রিটিশ কর্নেল রেজিনান্ড ডায়ের একটি নিরস্ত্র প্রতিবাদের ওপর নির্বিচারে গুলি করার আদেশ দিলে প্রচুর প্রাণহানি ঘটে।মেঘনাথ সাহা এর প্রতিবাদে লেখালেখি করেন। বিদ্যমান নূসংসতায় মনোবল হারিয়ে তিনি পদার্থবিদ্যার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ব্যস্ত থাকার চেষ্টা করেন। নিজের জ্ঞান দিয়ে তিনি ভারতের উন্নয়নকল্পে মননিবেশ করেন।
মেঘনাথ সাহার বিপ্লবী চরিত্রটি বাঙালি নেতৃত্বের দ্বারা প্রভাবিত ছিল, যারা গান্ধীবাদী আন্দোলনের বিপরীতে সশস্ত্র সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ হয়েছিল। সাহার বেড়ে ওঠার সময়কালীন রাজনৈতিক পরিবেশ তার ক্যারিয়ারে প্রবলভাবে ছাপ রেখে গিয়েছিল। তার চারিত্রিক বৈচিত্র, তার জীবন যাত্রার বৈচিত্র্য থেকেই উঠে এসেছে। বাঙালি ও ভারতীয় তরুণ সমাজের কাছে তিনিই হতে পারেন সবচেয়ে কাছের উদাহরণ এবং সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।