ড. খালিদ খুররম
দিল্লির সাম্প্রতিক বিস্ফোরণ আবারও স্পষ্ট করে দিয়েছে এক অস্বস্তিকর কিন্তু সুপ্রমাণিত বাস্তবতা, উগ্রপন্থার পথচলা শুরু হয় অস্ত্র দিয়ে নয়, বরং শব্দ দিয়ে, ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে বিকৃত করে তোলা এক বিপজ্জনক মতাদর্শিক পরিবেশ থেকে। দক্ষিণ এশিয়ার বহু অঞ্চলে গত শতাব্দীতে উৎপাদিত এক বড় অংশের অতিরিক্ত রাজনীতিকৃত ইসলামী সাহিত্য এখনো সহজেই প্রিন্ট ও ডিজিটাল মাধ্যমে পাওয়া যায়। ‘মুজাহিদ কি আজান’, ‘খুদা আওর বান্দা’-র মতো বই এবং এ ধরনের বহু গ্রন্থ সোশ্যাল মিডিয়া, মেসেজিং অ্যাপ ও কমদামি প্রকাশনা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে, বিশেষ করে জম্মু-কাশ্মীরের মতো সংবেদনশীল এলাকায় তরুণদের ভাবনা-চিন্তাকে প্রভাবিত করছে।
এসব লেখা জন্ম নিয়েছে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মুহূর্তের প্রেক্ষাপটে। এগুলো মূলধারার ইসলামী স্কলারশিপ নয়, বরং বিশেষ পরিস্থিতির আদর্শিক প্রতিক্রিয়া। কিন্তু প্রসঙ্গহীন পড়ার ফলে অনেকেই এগুলোকে ধর্মের কর্তৃত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা মনে করেন। দীর্ঘ সময় ধরে এসব সাহিত্য পড়তে পড়তে একদল তরুণের মনে ধীরে ধীরে উগ্রবাদী আকর্ষণ তৈরি হচ্ছে। আজকের নীতি-চ্যালেঞ্জ তাই শুধু সহিংস উগ্রবাদ দমন নয়; বরং সেই বোধগম্যতার বীজতলা, যে মানসিক মাটি থেকে তা জন্ম নেয়, তাকে মোকাবিলা করা।
প্রতীকী ছবি
এখানে একটি মৌলিক সত্যকে সামনে আনতে হবে: এ ধরনের সাহিত্য যে মতাদর্শ প্রচার করে, তা ইসলামের মূল নৈতিক বার্তার সরাসরি বিরোধী। কুরআনের মানব মর্যাদার ঘোষণা, “নিশ্চয়ই আমরা আদম সন্তানদের মর্যাদা দান করেছি” (১৭:৭০), এবং বিবেক ও বিশ্বাসের স্বাধীনতার পক্ষাবলম্বন, “ধর্মে কোনো জবরদস্তি নেই” (২:২৫৬), ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তি। ইতিহাসবিদদের মতে, নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর মদিনা-শাসন মানবসমাজে বহুত্ববাদ ও সমঅধিকারের অন্যতম প্রাচীন সাংবিধানিক দৃষ্টান্ত। ইমাম আবু হানিফা থেকে ইমাম গাজ্জালি পর্যন্ত মহান চিন্তাবিদরা যুক্তি, সহমর্মিতা, সহাবস্থান ও ন্যায়নীতির ওপর ভিত্তি করে ইসলামী ঐতিহ্য গড়ে তুলেছেন।
সমস্যা উগ্রপন্থী সাহিত্য থাকার মধ্যে নয়; সমস্যা হলো, আজ এসব সাহিত্য আরও দ্রুত, আরও বিস্তৃতভাবে ছড়িয়ে পড়ছে, অথচ ভারসাম্যপূর্ণ, প্রমাণভিত্তিক গবেষণা-নির্ভর লেখাগুলো ততটা দৃশ্যমান নয়। ডিজিটাল তথ্যবাজারে প্রান্তিক ব্যাখ্যাগুলো অতিরিক্ত প্রচার পাচ্ছে। তরুণেরা এখন ধর্মকে চিনছে ইউটিউব প্রিচার, টেলিগ্রাম চ্যানেল, সরলীকৃত মিম এবং অ্যালগরিদম-চালিত কনটেন্টের মাধ্যমে, যেখানে জটিল ধর্মতাত্ত্বিক ধারণা স্লোগানে পরিণত হয়।
কাশ্মীরের একটি বিশ্ববিদ্যালয়
এই জায়গাতেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো, বিশেষত জম্মু ও কাশ্মীরের, গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। তারা শক্তিপ্রয়োগ নয়, বরং জ্ঞানের নেতৃত্বের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান দিতে পারে। একটি বিশ্বাসযোগ্য পালটা-বয়ান প্রশাসনিক নির্দেশে তৈরি হয় না; তা তৈরি হয় জ্ঞান উৎপাদনের প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে।
এর জন্য প্রয়োজন একটি কাঠামোবদ্ধ একাডেমিক হস্তক্ষেপ। ধর্মতত্ত্ব, ইসলামিক স্টাডিজ, দর্শন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগগুলোকে গবেষণা করতে হবে সেই সাহিত্য নিয়ে, যা তরুণদের দৃষ্টিভঙ্গি গঠন করছে। এতে অন্তর্ভুক্ত থাকবে; সেই বইগুলোর রাজনৈতিক-ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ, ধর্মতত্ত্বের মূলধারা ও রাজনৈতিক পোলেমিকের পার্থক্য তুলে ধরা, ইসলামের অভ্যন্তরীণ বুদ্ধিবৃত্তিক বৈচিত্র্য ব্যাখ্যা করা। এভাবে উগ্রবাদী বয়ান যে বাছাই করা উদ্ধৃতি ও প্রসঙ্গচ্যুত ব্যাখ্যার ওপর দাঁড়িয়ে আছে, তা প্রকাশ পাবে।
একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তৈরি করতে হবে সহজবোধ্য পালটা-সাহিত্য। বর্তমান তথ্যপরিবেশে শুধু পাণ্ডিত্যপূর্ণ বই সমাজকে প্রভাবিত করতে পারে না। সংক্ষিপ্ত মনোগ্রাফ, নীতি-বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যামূলক প্রবন্ধ, ডিজিটাল মডিউল, পডকাস্ট ও তথ্যভিত্তিক ভিডিও, এসবই তরুণদের কাছে কুরআনিক নীতি ও ক্লাসিক্যাল গবেষণা-নির্ভর মানবিক ব্যাখ্যা পৌঁছে দিতে কার্যকর মাধ্যম। এর জন্য প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ, গবেষণা-ক্লাস্টার ও বিশ্ববিদ্যালয়নির্ভর আউটরিচ কৌশল।
সুফি নুন্দ রিশির মাজার
কাশ্মীরের নিজস্ব বৌদ্ধিক ঐতিহ্যকেও পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। লাল দেদ, নুন্দ রিশি ও শেখ নূরউদ্দিনের শিক্ষা সহাবস্থান, সমতা ও মানবতার গভীর ভিত্তির ওপর দাঁড়ানো। এ ঐতিহ্য সাংস্কৃতিক বিশ্বাসযোগ্যতা বহন করে, যা বহিরাগত মতাদর্শিক প্রভাবের চেয়ে অনেক শক্তিশালী। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কোর্স, বক্তৃতা ও সম্প্রদায়ভিত্তিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই ঐতিহ্য লিপিবদ্ধ, গবেষিত ও প্রচার করতে হবে।
নীতিগত দৃষ্টিকোণ থেকে, এই বৌদ্ধিক উদ্যোগকে সামগ্রিক র্যাডিকালাইজেশন-প্রতিরোধ কৌশলের অংশ হিসেবে যুক্ত করা জরুরি। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা-ব্যবস্থা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, শিক্ষাক্ষেত্রের বৌদ্ধিক প্রতিক্রিয়াও ততটাই অপরিহার্য। পুলিশিং, শিক্ষা ও জন-আলোচনার সমন্বিত কৌশলই সমস্যার মূলকে স্পর্শ করতে সক্ষম। ভারতের বহুত্ববাদী কাঠামো এমন উদ্যোগের জন্য উপযোগী পরিবেশ তৈরি করে, কিন্তু একাডেমিক উপাদানটি এখনো দুর্বল।
প্রতীকী ছবি
যদি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এই দায়িত্ব গ্রহণ করে, তার প্রভাব ক্যাম্পাসের বহু বাইরে পৌঁছাবে। একজন সচেতন ছাত্র উগ্রবাদে কম প্রভাবিত হয়, বরং সমাজে ভারসাম্যপূর্ণ উপলব্ধির প্রচারক হয়ে ওঠে। সমালোচনামূলক চিন্তা ও প্রাসঙ্গিক পাঠ শেখানো একটি শ্রেণিকক্ষ দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় নিরাপত্তার ভিত্তি গড়ে।
উগ্রবাদী মতাদর্শের বিরুদ্ধে লড়াই কেবল নিষেধাজ্ঞা বা দমননীতির মাধ্যমে জেতা যাবে না। এটির জন্য দরকার জ্ঞান ও নৈতিকতার ভিত্তিতে এক বৌদ্ধিক প্রতিরোধ, যা গবেষণায় প্রতিষ্ঠিত, নীতিতে সমর্থিত এবং সাধারণ মানুষের কাছে বোধগম্য উপায়ে পৌঁছে দেওয়া যায়। সহাবস্থানের ইসলামী নীতি পুনরুদ্ধার করা শুধু ধর্মীয় দায়িত্ব নয়; এটি একটি জাতীয় প্রয়োজন। আর এই বোধের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই সবচেয়ে উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান।