পুলিন ডেকা
অদম্য সাহস, দেশপ্রেম, কৌশলগত দক্ষতা এবং শৌর্যের অফুরন্ত প্রতীক লাচিত বরফুকন যেমনভাবে অসমের জাতীয় জীবনে আলো ছড়িয়ে গেছেন, সেই প্রেরণায় একবিংশ শতাব্দীতেও অসম তার নিজস্বতায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। তাঁর জীবন ছিল অনন্য সমাহারে পূর্ণ। আহোম সাম্রাজ্যের এই মহান সেনাপতি কেবল অসম নয়, সমগ্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকেও সুরক্ষিত করে বিশ্ব ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিলেন।
শরাইঘাটের যুদ্ধে লাচিত বরফুকন মোগলদের বিরুদ্ধে অসীম সাহস নিয়ে লড়াই করে জয় ছিনিয়ে এনে জাতীয় স্বাভিমানকে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিলেন। তাঁর সামরিক কৌশল, যুদ্ধ প্রস্তুতি, নৌবাহিনী পরিচালনা, সৈন্যদের মনোবল দৃঢ় করে তোলা এবং উপযুক্ত রণনীতি প্রণয়নের যে অসাধারণ ক্ষমতা তিনি মধ্যযুগে প্রদর্শন করেছিলেন, তা আজকের সময়েও সমানভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর নেতৃত্ব, কঠোর শৃঙ্খলা এবং অদ্বিতীয় অনুপ্রেরণা আহোম সৈন্যদের মনে প্রবল আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তুলেছিল।
শরাইঘাট যুদ্ধের একটি স্মৃতিস্তম্ভ
মোগলের মতো শক্তিশালী সাম্রাজ্যকে পরাজিত করা সহজ ছিল না। সৈন্যসংখ্যা, অস্ত্রশস্ত্র, নৌবাহিনী, প্রতিটি ক্ষেত্রেই মোগলদের আধিপত্য ছিল প্রবল। কিন্তু লাচিত বরফুকনের কৌশলগত দূরদর্শিতা এবং যথাসময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা শুধু বিজয় নিশ্চিত করেনি, বরং ভারতীয় সামরিক ইতিহাসে এক স্বর্ণযুগের চিহ্ন এঁকে গেছে।
লাচিত বরফুকন কেবল একজন সেনাপতি ছিলেন না, তিনি ছিলেন অসমীয়া জাতির আত্মসম্মানের প্রতীক। একটি লড়াকু, দৃঢ়চেতা জাতি কীভাবে গড়ে ওঠে, তার সর্বোচ্চ উদাহরণ তিনি সৃষ্টি করে গেছেন। তাঁর হৃদয়ে স্বদেশপ্রেম এমনভাবে শিকড় গেড়েছিল যে সেটিই তাঁর সাহসের ভিত্তি হয়ে উঠেছিল। সেই দেশপ্রেমকে সামনে রেখে তিনি জাতীয় সংহতি ও ঐক্যের এক শক্তিশালী সেতুবন্ধন রচনা করেছিলেন, যার কারণে সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষ তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল।
জাতি, ধর্ম, ভাষা নির্বিশেষে সকলকে এক মঞ্চে স্থান দিয়ে তিনি সমন্বয়ের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেন। আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করলে দেখা যায়, জাতীয় সত্তা নির্মাণের ক্ষেত্রে সকলকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে চলার যে নীতি তিনি গ্রহণ করেছিলেন, সেটিই মানুষের মানসিকতায় সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছিল। জাতীয় স্বার্থে সমন্বয়ের শক্তিই প্রকৃত চালিকাশক্তি, এ কথা তিনি প্রমাণ করে গেছেন।
যোরহাট জেলার লাচিত ময়দান
মোগলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লাচিত বরফুকন জাতীয় দায়বদ্ধতার পাশাপাশি একমুখী কর্মপদ্ধতির এক গৌরবময় দিক উন্মোচন করেছিলেন। তাঁর নেতৃত্বেই বাঘ হাজরিকার মতো যোদ্ধারা অসীম সাহস প্রদর্শন করতে সক্ষম হয়েছিল। লাচিত বরফুকন অসমীয়া জাতির আবেগ ও স্বাভিমানকে এমনভাবে জাগিয়ে তুলেছিলেন যে তাঁর সংগ্রামী সত্তা সমগ্র ভারতবাসীর কাছেও এক আদর্শে পরিণত হয়েছে।
আজকের নতুন প্রজন্মের কাছে লাচিত বরফুকন এক জীবন্ত আদর্শ। জীবনে এগিয়ে যেতে দৃঢ় সংকল্প, কর্মনিষ্ঠা এবং নিরলস পরিশ্রমের প্রয়োজন, এ কথার উজ্জ্বল উদাহরণ তিনি নিজেই। অধ্যবসায়, সাহস ও কঠোর পরিশ্রমের জোরেই তিনি আহোম রাজ্যের বরফুকন তথা প্রধান সেনাপতির পদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। দীর্ঘ পথচলায় তাঁর একাগ্রতা, কর্মস্পৃহা ও কর্তব্যনিষ্ঠা পরবর্তী সময়ে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছে।
তিনি সেনাবাহিনীর দায়িত্ব নেওয়ার পর সকলের আস্থা অর্জন করেন এবং একটি শক্তিশালী বাহিনী গড়ে তুলে মোগলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেন। আলবৈয়ের যুদ্ধে দশ হাজার আহোম সেনার মৃত্যুর ঘটনায় তিনি গভীরভাবে প্রভাবিত হন। সেই পরাজয়কে জয়ে রূপান্তরিত করতে তিনি সুপরিকল্পনা তৈরি করেন। দিন-রাত দুর্গ নির্মাণ করে কর্মনিষ্ঠ জাতীয় চেতনাকে জাগিয়ে তোলাই ছিল শরাইঘাট যুদ্ধের পূর্বপর্বের অন্যতম প্রধান দিক।
শরাইঘাটের নৌকা যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী লাচিত বরফুকনের একটি চিত্র
অন্যদিকে অসুস্থ দেহ নিয়েও তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিয়ে দেখিয়েছিলেন যে জাতীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে আর কিছু হতে পারে না। আলবৈয়ের পরাজয়কে জয়ে পরিণত করে তিনি প্রমাণ করেছিলেন অসমীয়া জাতির বীরত্ব এবং স্বদেশপ্রেম। গেরিলা যুদ্ধের যেসব কৌশল তিনি প্রয়োগ করেছিলেন, তার গুরুত্ব আজও সমাদৃত। সমগ্র ভারতবর্ষে মোগল আধিপত্যের সময় লাচিত বরফুকন এমন এক শক্তিকে পরাজিত করে দেশবাসীকে দেখিয়েছিলেন অসমের স্বতন্ত্র মাহাত্ম্য। আধুনিক বিশ্বে যে দক্ষতার কথা আজ বলা হয়, লাচিত বরফুকন সেই দক্ষতার পরিচয় মধ্যযুগেই দিয়েছিলেন।
শরাইঘাটের যুদ্ধে যদি তিনি মোগলদের প্রতিহত করতে ব্যর্থ হতেন, তবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জন্যও গভীর বিপর্যয় নেমে আসত। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে তিনি কেবল ভারতেরই নন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ারও এক মহান শক্তি ছিলেন। অসমীয়ার আবেগ ও চেতনাকে ধারণ করে থাকা লাচিত বরফুকনের অসীম সাহস ও বীরত্ব আজও অসমীয়া জাতির কাছে এক অনন্ত আদর্শ।
(লেখক একজন সাহিত্যিক। আজ লাচিত দিবস উপলক্ষে এই নিবন্ধ প্রকাশিত হলো।)