আরতি মুখোপাধ্যায়ের হাতে বঙ্গবিভূষণ সম্মান তুলে দিচ্ছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বৃহস্পতিবার কলকাতার ধনধান্য মঞ্চে
দেবকিশোর চক্রবর্তী
বাংলা সঙ্গীত জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, প্রজন্মের পর প্রজন্মকে যাঁর কণ্ঠে ভর করে সুরের মায়াজালে আবিষ্ট করেছে সেই কিংবদন্তী সঙ্গীতশিল্পী আরতি মুখোপাধ্যায় বৃহস্পতিবার বিকেলে কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের উদ্বোধনী মঞ্চে ‘বঙ্গবিভূষণ’ সম্মানে ভূষিত হলেন। দীর্ঘ ও গৌরবময় জীবনের এই বিশেষ মুহূর্তে মঞ্চে দাঁড়িয়ে শিল্পীর চোখে জল এসে গেল; আবেগে ভরে উঠল তাঁর কণ্ঠ।
সম্মান গ্রহণের পর এক সরল, তবু হৃদয়স্পর্শী কণ্ঠে তিনি বললেন, “এই সম্মান শুধু আমার নয়, এটি বাংলার সঙ্গীতপ্রেমী মানুষের ভালোবাসা। এই ভালোবাসাই আমার জীবনের আসল পুরস্কার।” মুহূর্তেই নন্দন প্রাঙ্গণ করতালিতে মুখর হয়ে উঠল। উপস্থিত দর্শক, সহশিল্পী এবং শুভানুধ্যায়ীদের চোখেও দেখা গেল এক অন্যরকম উচ্ছ্বাস ও আবেগ।
আরতি মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গীতজীবনের সূচনা খুব অল্প বয়সেই। শিশুকণ্ঠে রেডিওতে গান গাওয়া থেকে শুরু করে বাংলা, হিন্দি, ওড়িয়া ও অসমিয়া চলচ্চিত্রে অসংখ্য জনপ্রিয় গান তিনি উপহার দিয়েছেন। “তখন তোমার একুশ বছর বোধ হয়”, “কুহু কুহু কোকিল যদি ডাকে”, “জানি এ ভুল”, “শহরটার এই গোলক ধাঁধায়”, তাঁর কণ্ঠের মাধুর্য আজও শ্রোতাদের মন ছুঁয়ে যায়। প্রতিটি গানে তিনি যেন এক অনবদ্য আবেগ ঢেলে দিয়েছেন, যা সময়ের সীমানা ছাড়িয়ে চিরন্তন হয়ে রয়েছে।
এদিনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, যিনি নিজ হাতে এই সম্মাননা শিল্পীর হাতে তুলে দেন। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “আরতি দি আমাদের গর্ব। তাঁর কণ্ঠে যে জাদু, তা বাংলা সংস্কৃতির প্রাণস্বর। তিনি শুধুমাত্র একজন শিল্পী নন, তিনি আমাদের সংস্কৃতির উত্তরাধিকার।”
পুরস্কার গ্রহণের পর নীরব মুহূর্তে শিল্পী কিছুটা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। আলো ঝলমলে মঞ্চে তাঁর চোখে যেন ভেসে উঠল জীবনের পথচলার অসংখ্য স্মৃতি, রেকর্ডিং স্টুডিওর দিন, অসংখ্য সঙ্গীত পরিচালক ও সহশিল্পীর সঙ্গে সৃষ্টির মুহূর্ত, এবং শ্রোতাদের অগাধ ভালোবাসা। মঞ্চের আবহে তখন স্পষ্ট এক আবেগঘন নীরবতা, যা প্রমাণ করছিল – সত্যিকারের শিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধা কত গভীর হতে পারে।
সঙ্গীতপ্রেমী সমাজের অনেকেই মনে করেন, এই সম্মান অনেক আগেই তাঁর প্রাপ্য ছিল। তবু আজকের এই স্বীকৃতি যেন তাঁর এক দীর্ঘ সঙ্গীতযাত্রার পূর্ণতা এনে দিল। সঙ্গীত পরিচালক হেমন্ত মুখোপাধ্যায় থেকে শুরু করে এস. ডি. বর্মন, রাহুল দেব বর্মন, সকলের সঙ্গেই তিনি কাজ করেছেন সমান দক্ষতায়। তাঁর কণ্ঠের পরিশীলন, স্বরনিয়ন্ত্রণ এবং আবেগের গভীরতা তাঁকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।
আরতি মুখোপাধ্যায় আজও তরুণ প্রজন্মের জন্য এক অনুপ্রেরণা। যেভাবে তিনি শিল্পকে সাধনা হিসেবে গ্রহণ করেছেন, তা অনেকের কাছেই শিক্ষণীয়। পুরস্কার গ্রহণের শেষে তিনি বলেন, “জীবনের এই দীর্ঘ পথচলায় আমি একটাই জিনিস পেয়েছি, মানুষের ভালোবাসা। সেই ভালোবাসাই আমাকে আজও গান গাইতে শেখায়।”
বিকেলের সেই মঞ্চে, করতালি ও আলোঝলমলে পরিবেশের মধ্যেও এক মৃদু শান্তি নেমে এসেছিল। যেন সঙ্গীতের দেবী নিজে উপস্থিত হয়ে আশীর্বাদ করছেন তাঁর প্রিয় শিষ্যকে। দর্শক আসন থেকে উঠে দাঁড়িয়ে অনেকেই হাততালি দিয়ে জানালেন শ্রদ্ধা।
বাংলা সঙ্গীতের ইতিহাসে আরতি মুখোপাধ্যায়ের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তাঁর কণ্ঠের মাধুর্য, তাঁর গানের আবেগ, এবং আজকের এই অশ্রুসিক্ত সম্মানগ্রহণ, সব মিলিয়ে এটি শুধু এক শিল্পীর সাফল্য নয়, গোটা বাংলার সঙ্গীত-ঐতিহ্যেরও এক গর্বময় মুহূর্ত।