পশ্চিমবঙ্গের ইউ-টার্ন: কেন্দ্রের নতুন ওয়াক্ফ সংশোধন আইন ২০২৫ মেনে নিল রাজ্য সরকার
কলকাতা
মাসের পর মাস স্থগিত রাখার পর অবশেষে কেন্দ্রের ওয়াক্ফ সংশোধন আইন ২০২৫ গ্রহণ করল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। বৃহস্পতিবার রাতে এক গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশে রাজ্যের প্রশাসন জানিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে থাকা প্রায় ৮২,০০০ ওয়াক্ফ সম্পত্তির পূর্ণ বিবরণ আগামী ৬ ডিসেম্বর ২০২৫-এর মধ্যে কেন্দ্রীয় পোর্টাল umeedminority.gov.in–এ আপলোড করতে হবে। রাজ্যের শীর্ষ প্রশাসনিক কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে কেন্দ্র সব রাজ্যকে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে অবিবাদিত ওয়াক্ফ সম্পত্তির তথ্য আপলোডের নির্দেশ দিয়েছে, আর সেই কারণেই জেলা পর্যায়ে তথ্য সন্নিবেশ প্রক্রিয়া অবিলম্বে শুরু করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে, কারণ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বহুবার প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছিলেন যে তিনি এই সংশোধিত আইন রাজ্যে কার্যকর হতে দেবেন না।
সংসদে বিলটি পাস হওয়ার পর এপ্রিলে রাজ্যজুড়ে ব্যাপক প্রতিবাদ দেখা দেয় এবং ৯ এপ্রিল জৈন সম্প্রদায়ের এক অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্টভাবে বলেন, “আমি ওয়াক্ফ সংশোধন আইন বাংলায় কার্যকর হতে দেব না। আমরা ৩৩ শতাংশ মুসলিমের রাজ্য, তাঁদের সুরক্ষা দেওয়া আমার দায়িত্ব।” তবে আইনি লড়াইয়ের ক্ষেত্রেও রাজ্যের পক্ষে পরিস্থিতি অনুকূল হয়নি। আদালতে মামলা দায়ের করলেও প্রত্যাশিত স্বস্তি মেলেনি, কারণ আইনের ধারা ৩বি অনুযায়ী সমস্ত পঞ্জিভুক্ত ওয়াক্ফ সম্পত্তির তথ্য ছয় মাসের মধ্যে কেন্দ্রীয় পোর্টালে দেওয়া বাধ্যতামূলক।
প্রতীকী ছবি
সংখ্যালঘু বিষয়ক দপ্তরের সচিব পি. বি. সলিম জেলার প্রশাসকদের চিঠি দিয়ে জানিয়ে দিয়েছেন যে ‘উমীদ’ পোর্টালে তথ্য আপলোডের পুরো প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে এবং সেই সঙ্গে মুতওয়াল্লি, ইমাম ও মাদ্রাসা শিক্ষকদের সঙ্গে বৈঠক বা কর্মশালার মাধ্যমে প্রক্রিয়াটি ব্যাখ্যা করতে হবে।
জেলা প্রশাসনকে জানানো হয়েছে যে শুধুমাত্র অবিবাদিত সম্পত্তির তথ্য আপলোড করা যাবে এবং প্রয়োজনে প্রযুক্তিগত সহায়তার জন্য সহায়ক কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে যাতে কাজের কোনো বিলম্ব না ঘটে। নতুন সংশোধিত নীতিমালার অধীনে পশ্চিমবঙ্গের ৮,০৬৩ ওয়াক্ফ সম্পত্তির মুতওয়াল্লিদের ৬ ডিসেম্বরের মধ্যেই ইউএমআইডি পোর্টালে তাঁদের সম্পত্তির পূর্ণ বিবরণ জমা করা বাধ্যতামূলক।
ওয়াক্ফ সংশোধন আইন ২০২৫–এ এমন কিছু বিধান রয়েছে যা কেন্দ্র করে শুরু থেকেই বিতর্ক তৈরি হয়। আইনে ওয়াক্ফ বোর্ড এবং ওয়াক্ফ ট্রাইব্যুনালে অমুসলিম সদস্য নিয়োগের সুযোগ দেওয়া হয়েছে এবং কোনো সম্পত্তিকে ওয়াক্ফ ঘোষণা করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সরকারের হাতে ন্যস্ত করা হয়েছে। এই কারণেই পশ্চিমবঙ্গসহ দেশের বহু রাজ্যে তীব্র বিরোধিতা দেখা যায়। যদিও সংশোধনের কিছু অংশ এখনও সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন, তবুও বাস্তব পরিস্থিতি হলো, কেন্দ্রীয় নির্দেশ বাস্তবায়নে কোনো স্থগিতাদেশ না থাকায় রাজ্য বাধ্য হয়ে এই আইন প্রয়োগে সম্মতি জানিয়েছে।
প্রতীকী ছবি
অবশেষে রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সরে এসে প্রশাসনিক বাস্তবতা স্বীকার করল রাজ্য। আদালতের নির্দেশনা, কেন্দ্রের সময়সীমা এবং আইনগত বাধ্যবাধকতা, সব মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে ওয়াক্ফ সংশোধন আইন ২০২৫ কার্যকর করতে হয়েছে। এখন নজর থাকবে জেলা প্রশাসনের ওপর, যারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই বিশাল তথ্যভাণ্ডার আপলোডের কাজ কতটা সফলভাবে সম্পন্ন করতে পারে।