"ভারতীয় সংস্কৃতি মানুষে মানুষে ঐক্যের দেবত্ব জাগায়"- জামিয়া মিলিয়ায় বক্তৃতায় আরিফ মোহাম্মদ খান

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 1 d ago
জামিয়া মিলিয়া অনুষ্ঠানে বিহারের গভর্নর আরিফ মোহাম্মদ খান
জামিয়া মিলিয়া অনুষ্ঠানে বিহারের গভর্নর আরিফ মোহাম্মদ খান
 
নয়া দিল্লি

জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ায় অনুষ্ঠিত পঞ্চম খান আবদুল গাফ্ফার খান স্মারক বক্তৃতায় অংশ নিয়ে বিহারের রাজ্যপাল আরিফ মোহাম্মদ খান বলেন, ভারতীয় সংস্কৃতি মানুষের মাঝে এমন এক “মানবিক দেবত্ব” ধারণা প্রদান করে, যা অন্তর থেকে উদ্ভূত ঐক্যের অনুভূতি বহন করে। তাঁর ভাষায়, “আদি শঙ্করাচার্য থেকে স্বামী বিবেকানন্দ পর্যন্ত ভারতীয় মনীষীরা বিশ্বকে উপনিষদ ও বেদান্তের সার্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গি উপহার দিয়েছেন, যেখানে মানুষকে না ধর্মে, না জাতিতে, না বাহ্যিক পরিচয়ে বিভক্ত করা হয়, বরং প্রত্যেক মানুষকে ঈশ্বরত্বের ধারক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।”
 
“Reflections on Indian Culture: Making Sense of Its Universal Voice” শিরোনামে তিনি একটি বিস্তৃত ও অনুপ্রেরণাদায়ক বক্তৃতা প্রদান করেন। জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া (জেএমআই)-তে অনুষ্ঠিত পঞ্চম খান আবদুল গাফফার খান বার্ষিক স্মারক বক্তৃতা উপলক্ষে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে বিপুল সংখ্যক শিক্ষক, কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিলেন। উপস্থিতদের মধ্যে ছিলেন উপাচার্য প্রফেসর মাজহার আসিফ, রেজিস্ট্রার প্রফেসর মোহাম্মদ মহতাব আলম রিজভি, সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব সোশ্যাল ইনক্লুশন (CSSI)-এর ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ও ডিন প্রফেসর তনুজা এবং কনভেনার ড. মুজিবুর রহমান।
 
জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ায় অনুষ্ঠিত পঞ্চম খান আবদুল গাফ্ফার খান স্মারক বক্তৃতা অনুষ্ঠানের একটি দৃশ্য 
 
CSSI-এর আয়োজিত এই বার্ষিক বক্তৃতা ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের মহান বীর এবং অহিংসা, ঐক্য ও মানবতার বার্তাবাহক ভারতরত্ন খান আবদুল গাফ্ফার খান-এর স্মৃতির উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হয়। ২০১৭ সালে শুরু হওয়া এই বক্তৃতামালা ‘ফ্রন্টিয়ার গান্ধী’ নামে পরিচিত এই মহান পশতু্ন নেতার অবদানকে একাডেমিক পরিসরে সংরক্ষণ ও প্রচারের অনন্য উদ্যোগ হিসেবে স্বীকৃত।
 
অনুষ্ঠান সূচনা হয় এনসিসি ক্যাডেটদের গার্ড অফ অনার এবং জমকালো অভ্যর্থনার মাধ্যমে। পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত ও জামিয়া তারানা পরিবেশনের পর রাজ্যপাল খান গাফফার খানের প্রতিকৃতির সামনে প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করে অহিংসা, সাহস ও মানবকল্যাণের মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
 
তিনি বলেন, গাফ্ফার খান “পশতু্ন জনগোষ্ঠীকে শান্তির পথে এগিয়ে আসার ঐতিহাসিক রূপান্তর ঘটিয়েছিলেন, এবং তা সম্ভব হয়েছিল তাঁর অসাধারণ নৈতিক শক্তির কারণে।” বক্তৃতায় ভারতীয় সংস্কৃতির অনন্যত্ব ব্যাখ্যা করতে তিনি ভারতীয়, পারস্য, গ্রিক ও আরবি দর্শনচর্চার উদাহরণ তুলে ধরেন।
 
রাজ্যপাল খান বলেন, বিশ্বের পাঁচটি প্রধান সভ্যতার মধ্যে ভারতীয় সভ্যতা সর্বোচ্চ মর্যাদা পায় কারণ এর মূল আদর্শ জ্ঞান, সহাবস্থান ও প্রজ্ঞার বিস্তার। আল্লামা ইকবালের বিখ্যাত পংক্তি “মির-ই-আরব কো আই… থান্ডি হওয়া জাহা সে” উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, এ বাণী ইঙ্গিত দেয় যে ভারত এমন এক ভূমি, যেখান থেকে জ্ঞান ও প্রজ্ঞার শীতল হাওয়া বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।
 
জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ায় অনুষ্ঠিত পঞ্চম খান আবদুল গাফ্ফার খান স্মারক বক্তৃতা অনুষ্ঠানের একটি দৃশ্য 
 
বিবেকানন্দের সার্বজনীন বার্তা তুলে ধরে তিনি বলেন, ভারতের আধ্যাত্মিক, মানবিক ও প্রায়োগিক দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্বব্যাপী সংঘাত ও দুঃখ দূরীকরণের সবচেয়ে কার্যকর পথ। তাঁর কথায়, “বিশ্ব ১৯৪৮ সালে মানব মর্যাদার মূল্য উপলব্ধি করেছে, কিন্তু ভারত হাজার বছর ধরে মানুষের দেবত্বের বাণী প্রচার করে আসছে।”
 
রেজিস্ট্রার প্রফেসর রিজভি গাফ্ফার খানের অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয়তাবাদ ও খুদাই খিদমতগার আন্দোলনের কথা স্মরণ করে বলেন, গাফফার খানের জীবন প্রমাণ করে যে সত্যিকারের জাতীয়তাবাদ অহিংসা, সহানুভূতি, ন্যায়বিচার এবং মানব মর্যাদার সুরক্ষার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। ভারতের বিভাজন নিয়ে তাঁর গভীর বেদনা দক্ষিণ এশিয়ার সকল মানুষের সম্মিলিত স্বাধীনতার পক্ষে তাঁর বিশ্বাসকে আরও স্পষ্ট করে।
 
উপাচার্য প্রফেসর মাজহার আসিফ বলেন, জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া কেবলমাত্র একাডেমিক উৎকর্ষতার প্রতিষ্ঠান নয়, এটি সহমর্মিতা, সৌজন্য, দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা এবং জাতির সেবার আদর্শ ধারণ করে। তিনি বলেন, ভারতীয় সভ্যতার বৈচিত্র্য, বহুত্ববাদ এবং মতবিনিময়ের ধারাই গাফফার খানের জীবন ও ভাবনায় সবচেয়ে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। এর আগে রাজমোহন গান্ধী, অমিতাভকান্ত, প্রফেসর জোয়া হাসান ও প্রফেসর শ্রুতি কাপিলাও এই স্মারক বক্তৃতা প্রদান করেছেন।