জিআই ট্যাগ বদলে দিল ভাগ্য, মিথিলা মাখানার কৃষকদের জীবনে ফিরে আসছে সম্মান ও সমৃদ্ধি
আশহার আলম
বিহারের মধুবনি জেলার পান্দৌল গ্রামের ৫৮ বছরের সীতারাম সাহনি মিথিলা মাখানার রূপান্তরের এক গর্বিত সাক্ষী। প্রায় তিন দশক ধরে তাঁর জীবনের কেন্দ্র ছিল তাঁর পুকুর। একসময় তাঁর জীবন চলত এক চেনা ছন্দে, ভোরে পুকুরে কাজ, দুপুরে বীজ পরিষ্কার করা, আর সন্ধ্যায় দূরের ব্যবসায়ীদের হাতে নির্ধারিত অস্থির দামের ভয়ে উদ্বেগ। আবহাওয়া ছিল প্রতিকূল, লাভ ছিল অনিশ্চিত, আর মধ্যস্বত্ত্বভোগীরাই কুড়িয়ে নিতেন বড় অংশের অর্থ। তবু সাহনি কখনও হাল ছাড়েননি। “আমরা সবসময় জানতাম আমাদের মাখানা বিশেষ, বড়, সাদা আর সুস্বাদু,” গর্বে ভরা চোখে বলেন তিনি। “কিন্তু দুনিয়া তখনও সেটা জানত না।”
২০২২ সালে সবকিছু বদলে যায়, যখন মিথিলা মাখানা পায় কাঙ্ক্ষিত ভূ-সংকেত (Geographical Indication – GI) ট্যাগ, যা এই ফসলের স্বকীয়তাকে সেই ভূমি ও মানুষদের সঙ্গে যুক্ত করে যারা এটি লালন করে। সাহনির কাছে এটি শুধু একটি লেবেল ছিল না, ছিল আত্মপরিচয়ের স্বীকৃতি। “এই ট্যাগ আমাদের ফসলকে দিল নাম, ব্র্যান্ড আর সত্যতার প্রতিশ্রুতি,” জানান তিনি।
মাখানার উৎপাদনের এক কৃষক সীতা রাম সাহনি
দামের উন্নতি ও নতুন আত্মবিশ্বাস নিয়ে সাহনি ও তাঁর দুই ছেলে বড় স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। বাড়ির এক কোণে তৈরি করেন ছোট একটি প্রসেসিং ইউনিট, যেখানে মাখানা পরিষ্কার, ভাজা ও নিজেদের লেবেলে প্যাকেট করা হয়। পারিবারিক ঐতিহ্য থেকে শুরু হওয়া এই কাজ এখন পরিণত হয়েছে ছোট আকারের ব্যবসায়ে।
“আমার ছেলেরা আগে গ্রাম ছেড়ে শহরে চাকরি করতে যাওয়ার কথা ভাবত,” হাসি মুখে বললেন সাহনি। “এখন তারা ফিরেছে নিজেদের ব্র্যান্ড গড়তে। আর মধ্যস্বত্ত্বভোগীর ওপর নির্ভর করতে হয় না। আমরা এখন সরাসরি সেই ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করি যারা মিথিলা মাখানাকে বিশ্বাস করে।”
এখন তাঁদের পণ্য মধুবনি ও দরভাঙ্গার বাজারে ছড়িয়ে পড়েছে, ক্রেতারা তাঁদের নাম চেনে এবং গুণমানকে বিশ্বাস করে। বাড়তি আয়ে এসেছে আরামের জীবন, বাড়ি উন্নত হয়েছে, নাতি-নাতনিদের শিক্ষার সুযোগ বেড়েছে, আর দীর্ঘদিনের হারানো মর্যাদা ফিরে এসেছে।
মিথিলার মাখানা প্রক্রিয়াকরণ কারখানায় কর্মরত মহিলারা
“এই ট্যাগ শুধু আমাদের আয় বাড়ায়নি,” বলেন সাহনি। “এটা আমাদের আত্মসম্মান ফিরিয়ে দিয়েছে। আমাদের হাত আর আমাদের জমির প্রকৃত মূল্য আছে, এই বিশ্বাস এনে দিয়েছে।” সাহনির গল্প আজ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে মিথিলাঞ্চলের অগণিত পুকুরে, যেখানে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চাষিরা নতুন আশার আলো খুঁজে পাচ্ছেন একসময় অবহেলিত এই ফসলের মাধ্যমে।
দরভাঙ্গার বেনিপুরে ৪৮ বছরের মোহাম্মদ রশিদও একসময় মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা বাজারে বিক্রি করতে বাধ্য হতেন। “আগে রাজ্যের বাইরের ব্যবসায়ীরাই সব ঠিক করত। আমাদের কিছু বলার অধিকার ছিল না,” জানান তিনি। “এখন জিআই ট্যাগ পাওয়ার পর ক্রেতারা সরাসরি আমাদের কাছে আসে। দাম ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বেড়েছে। মনে হয় আমাদের শ্রম অবশেষে মর্যাদা পেল।”
রশিদ তাঁর পুকুরের ক্ষেত্রফল বাড়িয়েছেন এবং এখন দিল্লি ও লখনৌয়ের ব্যবসায়ীদের কাছে সরাসরি বিক্রি করেন। তিনি আধুনিক শুকানো ও প্যাকেজিংয়ের পদ্ধতি ব্যবহার করছেন, যাতে মাখানার সূক্ষ্ম স্বাদ বজায় থাকে। হাসতে হাসতে বলেন, “এটা শুধু ব্যবসার প্রসার নয়, এটা সম্মান। এখন মানুষ আমাদের উৎপাদনের মূল্য বোঝে।”
দরভাঙ্গার হায়াঘাট থেকে আফসার আলি
হায়াঘাট, দরভাঙ্গার ২৯ বছর বয়সী আফসার আলি প্রতিনিধিত্ব করেন আধুনিক, শিক্ষিত এবং প্রযুক্তিবান্ধব নতুন প্রজন্মের কৃষকদের। “জিআই ট্যাগ রপ্তানির সুযোগ খুলে দিয়েছে,” বলেন আফসার। “এখন পাটনা ও দিল্লির ব্যবসায়ীরা সরাসরি আমাদের কাছ থেকে সংগ্রহ করছে।” তিনি চালু করেছেন ভ্যাকুয়াম প্যাকিং ও ডিজিটাল মার্কেটিং, অনলাইনেও বিক্রি করছেন এবং অন্যান্য তরুণ কৃষকদের অনুপ্রাণিত করছেন, মাখানাকে শুধু ফসল হিসেবে নয়, ব্যবসায়িক সম্ভাবনা হিসেবে দেখতে। “মাখানা আমাদের ঐতিহ্য,” তিনি বলেন। “কিন্তু এখন এটা আমাদের পেশাও।”
পরিবর্তন সীমাবদ্ধ নয় কেবল পুরুষদের মধ্যে; মধুবনির ঝাঁঝরপুরের ৪২ বছরের সুনীতা দেবী জানান, কীভাবে নারীরা এখন এগিয়ে এসেছেন সমবায় ও স্বনির্ভর গোষ্ঠীর নেতৃত্ব নিয়ে। “আগে পুরুষরাই সব সামলাত, চাষ, বিক্রি, বাজার করা,” বলেন তিনি। “এখন আমরা নিজেরাই প্যাকেট করি ও বিক্রি করি। লাভ দ্বিগুণ হয়েছে, আর আত্মবিশ্বাসও।” তাঁদের দল ভাজা ও ফ্লেভারড মাখানা তৈরি করে নিজেদের ব্র্যান্ডে কাছাকাছি বাজারে বিক্রি করে। নারীদের কাছে এটি শুধু অর্থ উপার্জন নয়, এটি স্বাধীনতা, কণ্ঠস্বর এবং পরিবার ও সমাজে পরিচিতি পাওয়ার পথ।
দরভাঙ্গার লহেরিয়াসরাইয়ের ২৫ বছর বয়সী আকাশ কুমার এই গর্বকে এক কথায় ব্যাখ্যা করেন: “মিথিলা মাখানা শুধু আমাদের ফসল নয়; এটি আমাদের পরিচয়। জিআই ট্যাগ যেখানেই যায়, আমাদের নাম সঙ্গে নিয়ে যায়। এখন মানুষ আমাদের কাজকে বেশি সম্মান করে।” এই সম্মান দৃশ্যমান শুধু বাড়তি দামে নয়, বরং কৃষকদের উদ্যোক্তা, উদ্ভাবক এবং ঐতিহ্যের রক্ষক হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিতেও।
দারভাঙ্গার একটি মাখানা প্রসেসিং ইউনিটের কর্মীরা
২০২২ সালে জিআই ট্যাগ পাওয়ার পর মিথিলা মাখানার বাজারে এসেছে এক অসাধারণ পুনর্জাগরণ। দাম ২০২১ সালের প্রতি কেজি ৪০০–৫০০ টাকা থেকে ২০২৫ সালে ১,১০০–১,৬০০ টাকায় পৌঁছেছে, গুণমান অনুযায়ী। সংগঠিত প্রসেসিং ইউনিটের বিকাশে মধ্যস্বত্ত্বভোগীর ভূমিকা কমেছে এবং কৃষকের লাভ বেড়েছে।
বিহার সরকারের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং সমবায় মডেল পোস্ট-হার্ভেস্ট ব্যবস্থাপনা, ব্র্যান্ডিং ও প্যাকেজিং আরও শক্তিশালী করেছে। বিশ্ববাজারে সচেতনতা বাড়ার সাথে সাথে ‘সুপারফুড’ হিসেবে পরিচিত মাখানা এখন পৌঁছে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারেও।
(লেখক: একজন কমিউনিকেশন স্ট্র্যাটেজিস্ট)