অপর্ণা দাস / গুয়াহাটি
শরৎ-শীতের শুরুতেই নীল বা সাদা রঙের সুন্দর অপরাজিতা ফুল (butterfly pea flower) ফুটে ওঠে। তবে ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ঘর, বাগান ও মন্দিরের সামনে ফুটে ওঠা নীল কিংবা সাদা অপরাজিতা ফুল শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, মানুষের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার এক অনন্য ভরসা। প্রাচীন আয়ুর্বেদ থেকে আধুনিক বিজ্ঞানের গবেষণা, আজকের প্রজন্মকেও নতুন করে ভাবাচ্ছে এই সাধারণ অথচ আশ্চর্য ফুলকে।
আয়ুর্বেদের গ্রন্থ ‘চরক সংহিতা’ ও ‘সুশ্রুত সংহিতা’-তে অপরাজিতা বা শঙ্খপুষ্পী-র উল্লেখ পাওয়া যায়। স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি, স্নায়ুতন্ত্রের সুস্থতা, প্রদাহ কমানো ও মানসিক শান্তির জন্য এর ব্যবহার ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়। ভেষজ চিকিৎসার ইতিহাসে বহু ঋষি-মুনি একে "মন-শরীর সুস্থতার ফুল" বলে আখ্যা দিয়েছেন।
আধুনিক গবেষণাও প্রাচীন ধারণাকে শক্ত ভিত্তি দিচ্ছে। অপরাজিতা ফুল এবং পাতায় অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট (antioxidant), ফ্ল্যাভোনয়েড (flavonoid) এবং অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি (anti-inflammatory) যৌগ থাকার কারণে এটি শরীরকে টক্সিনমুক্ত করে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। পাশাপাশি মেমরি-বুস্টিং রাসায়নিক যৌগ মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বাড়িয়ে মানসিক চাপ কমাতে সহায়তা করে। সম্প্রতি চিকিৎসা গবেষণায় দেখা গেছে, অপরাজিতা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে, কারণ এটি রক্তে শর্করার মাত্রা কমাতে সাহায্য করে। আবার হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রেও এটি কার্যকর, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ এবং ক্ষতিকর কোলেস্টেরল হ্রাসে কাজ করে। বিপাকক্রিয়া উন্নত করার ক্ষমতার ফলে ওজন কমাতেও এটি সহায়ক। নীল রঙের ফুলে উপস্থিত অ্যান্থোসায়ানিন নামক পিগমেন্ট চোখের পেশি শক্তিশালী করে দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখতে সাহায্য করে বলেও বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে বিকল্প চিকিৎসা, যেমন ন্যাচারোপ্যাথি, যোগা থেরাপি এবং হোলিস্টিক মেডিসিনেও অপরাজিতার ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়েছে। মানসিক অবসাদ, অতিরিক্ত স্ট্রেস, অনিদ্রা এবং মনোযোগের ঘাটতি মোকাবিলায় অপরাজিতা-নির্ভর থেরাপি বেশ ফলপ্রসূ প্রমাণিত হচ্ছে।
আধুনিক যুগে অপরাজিতা ব্যবহারের তালিকাও বেড়েছে। আয়ুর্বেদিক চিকিৎসার গণ্ডি পেরিয়ে এটি এখন হারবাল চা, স্বাস্থ্যকর পানীয়, ত্বক ও চুলের সিরাম, ক্যাপসুল, ট্যাবলেটসহ নানা রূপে বিশ্ববাজারে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। সকাল-বিকেলের চায়ের বিকল্প হিসেবে অপরাজিতা চা সেবন এখন তরুণ প্রজন্মের মধ্যেও একটি স্বাস্থ্যকর ট্রেন্ডে পরিণত হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে জানাচ্ছেন, অপরাজিতা প্রাকৃতিক হলেও অতিরিক্ত সেবনে বমিভাব বা পেটের অস্বস্তির মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী ও শিশুদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এটি সেবন করা উচিত নয়।
শুধু স্বাস্থ্য নয়, সৌন্দর্যচর্চার ক্ষেত্রেও অপরাজিতা আজ এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনছে। আন্তর্জাতিক স্কিনকেয়ার ল্যাবরেটরিগুলো বলছে, অপরাজিতার নীল পিগমেন্টে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট UV রশ্মি থেকে ত্বককে রক্ষা করে এবং ত্বকের কোলাজেন ধরে রাখে, যার ফলে ত্বক থাকে টানটান ও উজ্জ্বল। চুলের যত্নের ক্ষেত্রেও এটি চোখে পড়ার মতো ফল দেয়। অপরাজিতা ফুল দিয়ে তৈরি অয়েল চুলের গোড়ায় রক্তসঞ্চালন বাড়িয়ে চুল ভাঙা, পড়া ও অকাল পাকা কমাতে দীর্ঘমেয়াদে সহায়তা করে। অনেক বিউটিশিয়ান এখন ত্বক ও মাথার ত্বকে হারবাল স্পা-ট্রিটমেন্টে অপরাজিতা ব্যবহার করছেন।
সৌন্দর্য, চিকিৎসা, আয়ুর্বেদ ও আধুনিক গবেষণার সমন্বয়ে অপরাজিতা আজ এমন এক ভেষজ সম্পদে পরিণত হয়েছে যা প্রাচীন চিকিৎসার গৌরবকে আধুনিক স্বাস্থ্য সচেতনতার সঙ্গে সুন্দরভাবে যুক্ত করেছে। তাই এই সাধারণ অথচ আশ্চর্য ফুলটি আজও প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে সুস্থতার নীরব রক্ষকের ভূমিকায় অনন্য মর্যাদা বহন করে চলেছে।