দেবকিশোর চক্রবর্তী
ভারতীয় সংগীতের ইতিহাসে সলিল চৌধুরীর নাম উচ্চারণ মানেই শ্রদ্ধা, বিস্ময় এবং গভীর আবেগের একত্র উপস্থিতি। তাঁর জন্মের একশো বছর পূর্তিতে আজ বাংলার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে নতুন করে আলোচিত হচ্ছে তাঁর সৃষ্টির ব্যাপ্তি, রাজনৈতিক চেতনা এবং মানবিক শিল্পদৃষ্টি। বহু ভাষায়, বহু ধারায়, বহু প্রজন্ম জুড়ে ছড়িয়ে থাকা তাঁর কাজ আজও সংগীতপ্রেমীদের কাছে এক অমূল্য সম্পদ।
সলিল চৌধুরীকে অনেকেই বলেন—“সময়ের আগের মানুষ”। কারণ তাঁর সুরের ধরন, অর্কেস্ট্রেশনের ভাষা, সংগীতচিন্তা এবং সামাজিক মনন এমন এক উচ্চতায় পৌঁছেছিল, যা ভারতের জনপ্রিয় সংগীতে বহু বছর পরে এসে স্বীকৃতি পেয়েছে। পশ্চিমা বহুস্বরতা ও ভারতীয় রাগভিত্তিক সুরের অনন্য মেলবন্ধন তিনি এমন স্বাভাবিকতা দিয়ে ঘটিয়েছিলেন যে তা বাংলা গানকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছে। তাঁর গানে একদিকে শোনা যায় আধুনিকতার স্পষ্ট ছাপ, অন্যদিকে মানুষের জীবনসংগ্রাম, প্রেমের নিগূঢ়তা এবং প্রকৃতির টানটান সুর।
বাংলা সংগীতে তাঁর অবদান ব্যাপক। “গাঁয়ের বধূ”, “ধিতাং ধিতাং বোলে”, “আমায় প্রশ্ন করে নীল ধ্রুবতারা”, “বুঝবে না কেউ বুঝবে না”, “ও মোর ময়না গো”—এমন বহু গান আজও শ্রোতার হৃদয়ে আবেগের ঢেউ তোলে। তাঁর প্রতিটি সৃষ্টি যেন মানুষের দৈনন্দিনতার সঙ্গে শিল্পের গভীর ভাবনাকে যুক্ত করে। কখনো তিনি গল্প বলছেন, কখনো প্রতিবাদ করছেন, কখনো আবার নিঃশব্দ এক যন্ত্রণাকে সুরের ভাঁজে ফেলে দৃশ্যমান করছেন।
চলচ্চিত্র সংগীতেও তিনি ছিলেন এক নতুন দিগন্তের পথিকৃত। হিন্দি, মালায়লম, তামিলসহ বিভিন্ন ভাষার অসংখ্য চলচ্চিত্রে কাজ করে তিনি ভারতীয় ফিল্ম-মিউজিকের ধারা বদলে দেন। তাঁর সুরে যেমন ছিল মাধুর্য, তেমনি ছিল পরীক্ষা-নিরীক্ষার সাহস। নতুন যন্ত্রসংযোজন, ভিন্ন কোরাসব্যবহার, রিদমে অনন্য বৈচিত্র—সব মিলিয়ে তিনি চলচ্চিত্র সংগীতকে শিল্পের এক নবপরিসর দেন। তাঁর প্রতিটি রচনা যেন পর্দার গল্পকে আরেকটি জীবন দেয়, দর্শকের আবেগকে আরও গভীর করে।
তবে সলিল চৌধুরীকে বোঝা যায় না কেবল সুরকার হিসেবে; তাঁকে জানতে হয় তাঁর রাজনৈতিক ও মানবিক ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে। জাতীয় আন্দোলন, বামপন্থী চেতনা এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ—এসব তাঁর সৃষ্টির সঙ্গে অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা। ভারতীয় গণনাট্য সংঘ (আইপিটিএ)-এর সঙ্গে যুক্ত থেকে তিনি দেখেছিলেন মানুষ কীভাবে বঞ্চিত হয়, সমাজ কেমন করে ভেঙে যায়, আবার কীভাবে সাধারণ মানুষই জীবনকে গড়ে তোলে। এই দর্শনই তাঁর লেখায় ও সুরে তুলে এনেছিল শ্রমজীবী মানুষের ব্যথা, আশা ও দাঁড়িয়ে যাওয়ার শক্তি।
জন্মশতবর্ষের এই সময়ে সংগীতবিশেষজ্ঞদের মত—সলিল চৌধুরী কেবল একজন শিল্পী নন, তিনি এক আন্দোলন। তিনি দেখিয়েছেন যে সংগীত শুধু বিনোদন নয়, এটি সমাজকে প্রশ্ন করার, মানুষকে এক করার এবং মানবিক মূল্যবোধকে জাগিয়ে তোলার একটি শক্তিশালী মাধ্যম। আজও তাঁর তৈরি সুর শুনলে মনে হয়, সময়কে অতিক্রম করে তিনি যেন আমাদের সঙ্গে কথা বলে চলেছেন।
সাংস্কৃতিক মহলের দাবি—সলিল চৌধুরীর বিপুল সৃষ্টিসম্ভারকে নতুনভাবে সংরক্ষণ, ডিজিটাল আর্কাইভ তৈরি এবং তরুণ প্রজন্মের সামনে পৌঁছে দেওয়া জরুরি। কারণ তাঁর কাজ শুধু শ্রুতিমধুর নয়; তা আমাদের ইতিহাস, সংগ্রাম এবং শিল্পবোধেরও গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
শতবর্ষে সলিল চৌধুরীকে স্মরণ মানে কেবল অতীতকে শ্রদ্ধা নয়—বরং এই বিশ্বাস পুনরায় উচ্চারণ করা যে শিল্প সত্যের পাশে দাঁড়ায়, মানুষকে এক করে, আর সুরের মধ্যে লুকিয়ে থাকে পরিবর্তনের ডাক।