বাংলায় একাদশ–দ্বাদশ শিক্ষক নিয়োগে বাড়তে পারে শূন্যপদ, আশ্বাস মন্ত্রী ব্রাত্য বসুর
দেবকিশোর চক্রবর্তী
একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষক নিয়োগের ইন্টারভিউ তালিকা প্রকাশের পর থেকেই রাজ্যের হাজারো চাকরিপ্রার্থীর মধ্যে অনিশ্চয়তার মেঘ ঘনিয়ে উঠেছে। কমিশন প্রকাশিত তালিকায় দেখা গেছে, যাঁরা শুধুমাত্র উচ্চমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকতার জন্যই পরীক্ষা দিয়েছিলেন, তাঁদের একটি বড় অংশ ইন্টারভিউয়ের জন্য ডাক পাননি। এই পরিস্থিতিতে ৩১ ডিসেম্বরের পর বহু দক্ষ ও প্রশিক্ষিত প্রার্থী চাকরিহীন হয়ে পড়তে পারেন—এমন আশঙ্কাই এখন জোরালো।
এই উদ্বেগের মধ্যেই মঙ্গলবার শিক্ষা মন্ত্রী ব্রাত্য বসু জানান, সরকার প্রার্থীদের অবস্থার প্রতি সংবেদনশীল এবং যোগ্য কেউ যাতে বঞ্চিত না হন, তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তাঁর কথায়, “ইন্টারভিউ প্রক্রিয়া ও মূল্যায়ন চলাকালীন কোনো সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা যায় না। তবে যদি দেখা যায় যে বহু যোগ্য প্রার্থী বিধিগত কারণে বা নম্বরের অল্প ব্যবধানে বাদ পড়ে যাচ্ছেন, তাহলে শূন্যপদ বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হবে।”
মন্ত্রী আরও জানান, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে এই বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। তবে শূন্যপদ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত কেবল প্রশাসনিক নয়, বরং আর্থিক, পরিষেবা-সংক্রান্ত নিয়ম এবং আদালতের নির্দেশ—তিন দিক বিচার করেই নিতে হবে। “আমরা ইতিমধ্যেই আইনি পরামর্শ নিচ্ছি,” বলেন ব্রাত্য বসু। “রাজ্যের শিক্ষক সংকট দূর করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি নিয়োগের প্রতিটি ধাপে আইনি স্বচ্ছতা রক্ষা করাও জরুরি।”
ইন্টারভিউ তালিকা প্রকাশের পর থেকেই প্রার্থীদের অভিযোগের যেন শেষ নেই। অনেকের দাবি, ইন-সার্ভিস প্রার্থীরা তাঁদের চাকরির অভিজ্ঞতার জন্য অতিরিক্ত নম্বর পাচ্ছেন, ফলে নতুন প্রার্থীরা প্রতিযোগিতায় স্বাভাবিকভাবেই পিছিয়ে পড়ছেন। বেশ কিছু প্রশিক্ষিত প্রার্থী জানিয়েছেন, তাঁরা লিখিত পরীক্ষায় যথেষ্ট নম্বর পেলেও অভিজ্ঞতার অভাবে ইন্টারভিউ তালিকায় স্থান পাননি। এক প্রার্থীর কথায়, “যদি অভিজ্ঞতার নম্বরই এত বেশি প্রভাব ফেলবে, তাহলে নতুন প্রার্থীরা কীভাবে সমান সুযোগ পাবেন?”
এছাড়া আবার উঠেছে “টেইন্টেড” প্রার্থী বিতর্ক। ২০১৬–র নিয়োগ দুর্নীতির জেরে যাঁদের নাম ‘দাগি’ তালিকায় ছিল, তাঁদের মধ্যে কেউ কি নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ইন্টারভিউয়ের ডাক পেয়েছেন—এ প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই। যদিও মন্ত্রী এই অভিযোগকে গুরুত্বহীন বলে উড়িয়ে দেন। তাঁর যুক্তি, ‘টেইন্টেড’ ও ‘নন-টেইন্টেড’ প্রার্থীর আলাদা তালিকা প্রকাশ আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী অবমাননার শামিল হতে পারে। ফলে সরকার আইনি সীমানার মধ্যে থেকেই কাজ করছে।
ব্রাত্য বসুর কথায়, “সুপ্রিম কোর্ট ও হাই কোর্ট—উভয় আদালতের নির্দেশ মেনে আমরা নিয়োগ প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছি। কাউকে অন্যায় বা অবিচারের মুখে ফেলব না। প্রতিটি ধাপই স্বচ্ছতার সঙ্গে সম্পন্ন হবে।” তিনি আরও জানান, কোনো প্রার্থী যদি মনে করেন যে তাঁকে অন্যায়ভাবে বঞ্চিত করা হয়েছে, তাহলে তারা কমিশনের কাছে অভিযোগ জানাতে পারেন এবং সমস্ত অভিযোগ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে।
চাকরিহীন হওয়ার আতঙ্কে প্রার্থীদের একটি বড় অংশ ইতিমধ্যেই বিভিন্ন সংগঠনের মাধ্যমে আন্দোলনে নেমেছেন। চাকরিহারা শিক্ষকদের একাংশের বক্তব্য, “আমরা বহু বছর ধরে বিদ্যালয়ে কাজ করেছি। এখন যদি এই নিয়োগে ডাক না পাই, তবে পরিবার নিয়ে বাঁচব কী করে?” তাঁদের মতে, শূন্যপদ বৃদ্ধি হলে অন্তত যোগ্যদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
রাজনৈতিক মহলেও শুরু হয়েছে চাপানউতোর। বিরোধীরা অভিযোগ করেছেন, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আবারও অস্বচ্ছতার অভিযোগ উঠছে। যদিও সরকার সেই দাবি মানতে নারাজ।
এখন সবার চোখ রাজ্যের পরবর্তী প্রশাসনিক পদক্ষেপের দিকে। ইন্টারভিউ প্রক্রিয়া শেষ হলে এবং মেধা তালিকা প্রকাশ পেলে প্রকৃত অবস্থান স্পষ্ট হবে। শূন্যপদ বৃদ্ধি হলে বহু প্রার্থী নতুন করে আশার আলো দেখবেন। আর যদি বৃদ্ধি না হয়, তবে প্রার্থীদের বড় অংশকে নতুন করে ভবিষ্যতের চিন্তা করতে হবে।
নিয়োগের পরবর্তী কয়েকটি সপ্তাহই তাই নির্ধারণ করবে—কারা শিক্ষকতার প্রাঙ্গণে পা রাখতে পারবেন আর কারা আবারও অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ঢেকে পড়বেন।