সানিয়া আঞ্জুম
উগ্রবাদের জন্ম খুব কমই অস্ত্র দিয়ে শুরু হয়, বরং শুরু হয় মানুষের মনের ভেতর থেকে। যখন কেউ আঘাতপ্রাপ্ত, বঞ্চিত, ভুল তথ্যপ্রাপ্ত বা বিচ্ছিন্নতা অনুভব করে, তখনই উগ্র চিন্তার বীজ অঙ্কুরিত হয়। এই উগ্রবাদ রোধের সবচেয়ে শক্তিশালী স্থান হলো শ্রেণিকক্ষ। সমুদ্রতীরের মাদ্রাসা হোক, ব্যস্ত পৌর বিদ্যালয় হোক বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষণমঞ্চ, শিক্ষকরাই আবেগিক ও নৈতিক শব্দভাণ্ডার গড়ে তোলেন, যার মাধ্যমে তরুণ-তরুণীরা পৃথিবীকে বুঝতে শেখে।
অবিশ্বাস ও ডিজিটাল উসকানিমূলক উগ্রবাদের ছায়ায় ঘেরা এই সময়ে ভারতের শিক্ষকেরা একটি বিশাল দায়িত্ব বহন করছেন, কৌতূহলকে যাতে ভয় জয় করতে না পারে এবং বিভাজনের উপর যেন সহানুভূতি জয়ী হয়। এই প্রভাব কেবল পাঠ্যপুস্তকে নয়, প্রতিদিনের ছোট ছোট নির্দেশনায়, ক্লাসের পেছনের আলাপচারিতায়, সকালে অ্যাসেম্বলিতে বলা গল্পে এবং তরুণ মনের নীরবভাবে গড়ে ওঠা নৈতিক ভিতের মধ্যেও প্রকাশ পায়। তাই ভারতের শিক্ষকরা আজ দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শান্তিরক্ষী হিসেবে বিবেচিত।
প্রতীকী ছবি
২০১৫ সালে গণেশ চতুর্থী উদযাপনের সময় মুম্বাইয়ের কোলাবায় একটি শান্তির অনন্য দৃশ্য দেখা গিয়েছিল। জিপাল কোলাবা সেবা সংঘ গণেশোৎসব মণ্ডপে যখন পাশের রহমানতিয়া তালিমুল কোরআন মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের ঈদ-উল-আজহা নামাজ পড়ার জায়গার অভাব হয়, তখন হিন্দু আয়োজকেরা তাঁদের উৎসবের প্যান্ডেলটি ২০০-রও বেশি মুসলিম ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকের জন্য উন্মুক্ত করে দেন। গণেশ মূর্তির ঠিক পাশেই নামাজ পড়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
‘দ্য বেটার ইন্ডিয়া’–র প্রতিবেদন অনুসারে, বিষয়টি কোনো হঠাৎ সিদ্ধান্ত ছিল না, বরং বহু বছরের মূল্যভিত্তিক শিক্ষার ফল। মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে শিখিয়ে আসছে, বন্ধুত্বের মধ্য দিয়ে বিশ্বাস জন্মায়। এই ঘটনাটি আজ দেশের সব শিক্ষকের কাছে উদাহরণ হয়ে আছে। বাস্তব জীবনের এমন গল্পগুলো যখন সচেতনভাবে পাঠপরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত হয়, তখন উগ্রবাদ জন্ম নেওয়ার অনেক আগেই তা প্রতিরোধ করা যায়।
ভারত হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান, শিখ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সহাবস্থানের অনন্য দেশ, যা যেমন বৈচিত্র্যময়, তেমনই ভঙ্গুর। উগ্র প্রভাবকরা বিচ্ছিন্নতাকে কাজে লাগায়, কিন্তু বিভাজন ঘটার আগেই ঐক্যকে দৃঢ় করার ক্ষমতা শিক্ষকদের হাতে রয়েছে। ২০২৩ সালে ইউএনডিপি–র এক গবেষণা বলছে, গুণগত শিক্ষা একটি সমাজে উগ্র মতাদর্শের সংবেদনশীলতা ৫০% পর্যন্ত কমাতে পারে। একটি স্তরভিত্তিক শিক্ষাপদ্ধতি এটি সম্ভব করে তুলতে পারে:
১. ভিত্তি স্তর (প্রাথমিক / মাদ্রাসা)
কোলাবা মন্দির-প্যান্ডেল ভাগ করে নেওয়ার গল্পের মতো সহজ ‘সম্প্রীতি বৃত্ত’ চালু করা। মাদ্রাসা পাঠক্রমে জামিয়াত উলামা-ই-হিন্দ (২০২২)–এর মতো আন্তঃধর্মীয় শিক্ষামডিউল যুক্ত করা। কোরআন ৪৯:১৩–এর সাথে ঋগ্বেদ উদ্ধৃত বাক্য যুক্ত করা, “সত্য এক, জ্ঞানীরা তাকে নানা নামে অভিহিত করেন।”
২. মাধ্যমিক স্তর
অতিথি বক্তৃতা, ভিডিও ও বিতর্কের মাধ্যমে, মদিনার সংবিধান, ‘গুড সামারিটান’, গুরু নানকের লঙ্গর, উত্তর–পূর্ব ভারতের শান্তি প্রতিষ্ঠার পাঠ ইত্যাদি উদাহরণ অন্বেষণ করা। কাউন্সেলিং সেশনের মাধ্যমে সংস্কারাভ্যাস ভাঙা ও বহুত্ববাদকে বাস্তবে অনুভব করানো।
৩. উচ্চশিক্ষা
জাতীয় শিক্ষা নীতি ২০২০–এর অধীনে বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন ধর্মের পণ্ডিতদের নিয়ে “শাস্ত্র মঞ্চ” আয়োজন করা। শিক্ষার্থীরা ভারতের বহুত্ববাদের সাথে তুলনা করে ইউরোপীয় ইউনিয়নে উগ্রবাদের প্রসার যেমন SGP’s ‘Save the Youth’ মডেল অধ্যয়ন করতে পারে এবং আন্তঃধর্মীয় পডকাস্ট তৈরি করতে পারে, ভবিষ্যতের শান্তি স্থপতি হয়ে উঠতে।
প্রতীকী ছবি
বহুত্ববাদের শাস্ত্রীয় ভিত্তি, যা আমাদের মধ্যেই ছিল
বহুত্ববাদ কোনো আমদানিকৃত ধারণা নয়, এটি ভারতের আত্মায় চিরদিনের। শিক্ষকরা শুধু সেই শিকড়কে আবার জীবন্ত করে তুলছেন:
ইসলাম: সাহিহ আল–বুখারিতে বর্ণিত বিলালের কাহিনী বর্ণবাদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী বার্তা দেয়
হিন্দুধর্ম: অথর্ববেদ ১২.১.১ পরিবেশ ও সামগ্রিক মূল্যবোধ শেখায়
খ্রিস্টধর্ম: গুড সামারিটান সহানুভূতির শিক্ষা দেয়
শিখধর্ম: লঙ্গর সমতা ও সেবার প্রতীক
২০২৫ সালে কেরালার শিক্ষা বিভাগ নির্বাচিত জেলাগুলোতে ‘শান্তি সাক্ষরতা ল্যাব’ চালু করেছে, অনলাইন উগ্রবাদ মোকাবিলায়। শিক্ষক ও প্রশিক্ষিত কাউন্সেলর যৌথভাবে বিভিন্ন ধর্মের শিক্ষার্থীদের নিয়ে ঘৃণার ঘটনা বিশ্লেষণ, পাল্টা-ন্যারেটিভ নির্মাণ ও সংঘাত কমানোর কৌশল অনুশীলন করাচ্ছেন।
সবচেয়ে উদ্ভাবনী বৈশিষ্ট্য হলো, “শেয়ার্ড ট্র্যাডিশনস পোর্টফোলিও” যেখানে শিক্ষার্থীরা ইসলাম, হিন্দু, খ্রিস্টান, শিখ, বৌদ্ধ ইত্যাদি ঐতিহ্যের মিল খুঁজে নথিভুক্ত করে। শিক্ষকরা জানিয়েছেন, এই উদ্যোগ সাম্প্রদায়িক মনোভাব কমাচ্ছে এবং আন্তঃধর্মীয় বন্ধুত্ব বাড়াচ্ছে। যেকোনো স্কুলেই ছোট আকারে শান্তির ল্যাব, রোল–প্লে মডিউল বা মূল্যভিত্তিক জার্নালিং চালু করা সম্ভব।
শিক্ষকদের কাজ সফল করতে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা জরুরি। এর মধ্যে থাকতে হবে: মাদ্রাসাগুলোকে ভার্চুয়াল আন্তঃধর্ম বিনিময়ের জন্য ডিজিটাল সহায়তা, শাস্ত্র বৃত্ত ও ঐক্যভিত্তিক পাইলট কার্যক্রমের জন্য অর্থায়ন, বহুত্ববাদী ঐতিহাসিক বিষয় পাঠ্যক্রমে পুনঃপ্রবর্তন। যদি পাঠ্যবই অপসারণের যুক্তি হয় উত্তেজনা কমানো, তবে ঐক্যকে শক্তিশালী করার পঠিত সংযোজনই তার প্রকৃত নিরাময়।
প্রতীকী ছবি
শিক্ষকের উন্মুক্ত ভালোবাসার কারণেই কোলাবার সেই প্যান্ডেল আশ্রয়কেন্দ্রে রূপ নিয়েছিল। আজ ১৪০ কোটি মানুষের দেশে শিক্ষকরা নীরব বিপ্লবী, মাদ্রাসার মেঝে থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাগৃহ পর্যন্ত উগ্র মতাদর্শের বিরুদ্ধে একটানা দাঁড়িয়ে আছেন। বহুত্ববাদ যখন সাহস নয়, অভ্যাসে পরিণত হয়, তখন উগ্রবাদ ধসে পড়ে। তখন ঐক্য কেবল কল্পনা নয়, এটি শেখানো হয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমরা প্রত্যক্ষ করেছি, মধ্যযুগীয় শাসক, কবি বা ঐতিহাসিক ঘটনার বহু অধ্যায় নীরবে পাঠ্যক্রম থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ এড়ানোর অজুহাতে। তাহলে প্রশ্ন হলো, যদি বিভাজনের আশঙ্কায় পাঠ্য ক্রম এত দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে, তবে ঐক্য গড়ে তোলা পাঠ্য সামগ্রী যুক্ত করতে দ্বিধা কেন?
যদি পাঠ্যবই রাতারাতি কুসংস্কারমুক্ত করা যায়, তবে সেগুলো সহজেই উগ্রবাদ প্রতিরোধী মুল্যবোধে পূর্ণ করা যায়, কোলাবার গল্পের মতো সংক্ষিপ্ত উপযোগী অনুপ্রেরণামূলক গল্প, কোরআন ও বৈদিক বহুত্ববাদের পাঠ, মুফতি ও সন্ন্যাসীরা ঘৃণার বিরুদ্ধে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ানোর বাস্তব উদাহরণ। যা থেকে আমরা দূরে সরে দাঁড়াচ্ছি ভয় থেকে, সেখানেই আমরা স্থাপন করতে পারি আশা। সব ব্যবস্থা আমাদের হাতেই আছে, অপেক্ষা শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও নৈতিক দূরদৃষ্টির।