স্কুলে স্কুলে এক সুরে ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’ রাজ্যের নতুন নির্দেশে ঐক্যের বার্তা
শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ
একটা সময় ছিল, সকালে স্কুলের ঘণ্টা বাজতেই ভেসে উঠত ভিন্ন ভিন্ন প্রার্থনা সংগীত— কোথাও রবীন্দ্রসঙ্গীত, কোথাও দেশাত্মবোধক গান, আবার কোথাও দেবতার আরাধনা। প্রত্যেকটি স্কুলের আলাদা আলাদা গানেই যেন ধরা পড়ত রাজ্যের বৈচিত্র্য। তবে এবার সেই বৈচিত্র্যেই আসছে এক নতুন ঐক্যের সুর। রাজ্যের প্রতিটি স্কুলে প্রার্থনা সংগীত হিসেবে এখন থেকে গাওয়া হবে একটাই গান— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’।
পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ থেকে এদিন এই বিষয়ে একটি সরকারি নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে। তাতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, রাজ্যের সমস্ত সরকারি, সরকারপোষিত ও বেসরকারি স্কুলে প্রতিদিনের প্রার্থনায় এই গানটি বাধ্যতামূলকভাবে গাইতে হবে। নির্দেশিকায় উল্লেখ করা হয়েছে, গানটি নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেশাত্মবোধ, ঐক্য ও রাজ্যের সাংস্কৃতিক গর্বের চেতনা জাগ্রত করাই এর মূল উদ্দেশ্য।
উল্লেখযোগ্যভাবে, চলতি বছরের ১১ই ফেব্রুয়ারি সরকারিভাবে ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’ গানটিকে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সংগীত হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল। এই সিদ্ধান্তের পর নবান্নের তরফে জানানো হয়েছিল— গানের মোট চারটি লাইন (প্রথম ও শেষ দুই লাইন মিলিয়ে) রাজ্য সংগীত হিসেবে গৃহীত হয়েছে। নির্দেশিকা অনুযায়ী, গানটির আনুমানিক সময়কাল এক মিনিট, এবং এটি জাতীয় সঙ্গীতের সমমর্যাদা পাবে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের উত্তাল সময় লিখেছিলেন এই গানটি। তখন সারা বাংলায় চলছিল বিভাজনের বিরুদ্ধে এক সুরে প্রতিবাদ। ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’ তাই শুধু এক গান নয়— একতার, প্রতিবাদের ও স্বভূমির প্রতি ভালোবাসার প্রতীক হয়ে উঠেছিল।
এবার সেই ঐতিহাসিক গানকেই প্রতিদিনের প্রার্থনা সংগীত হিসেবে গাইতে হবে রাজ্যের সমস্ত স্কুলে। শিক্ষা দফতরের তরফে জানানো হয়েছে, এই সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতি আবেগ জাগ্রত করবে, পাশাপাশি তাদের মনে অখণ্ড বাংলার ধারণা দৃঢ় করবে।
তবে প্রশাসনিক এই নির্দেশকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলে তৈরি হয়েছে নানা জল্পনা। বর্তমানে রাজ্যজুড়ে চলছে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR) প্রক্রিয়া। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সম্প্রতি একাধিক সভায় অভিযোগ করেছেন, “বিজেপি চায় বাংলার ২ কোটি মানুষকে আলাদা করে বাংলাকে দুর্বল করে দিতে, এমনকি বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিতে চায়।” সেই প্রেক্ষিতেই রাজ্য সরকারের এই নির্দেশ অনেকের কাছে রাজনৈতিক প্রতিস্বর বলে মনে হচ্ছে। বিশেষত, ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’ গানকে প্রতিদিন স্কুলে গাওয়ার সিদ্ধান্তকে কেউ কেউ দেখছেন অখণ্ড বাংলার বার্তা হিসেবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ছোটবেলা থেকেই যদি শিক্ষার্থীরা বাংলার মাটির সঙ্গে নিজেদের পরিচিতি ও গর্ববোধ তৈরি করে, তবে তা ভবিষ্যতে সামাজিক ঐক্য ও সাংস্কৃতিক সংহতি বজায় রাখতে সহায়তা করবে। রবীন্দ্রনাথের গান বেছে নেওয়ার মধ্যেও আছে এক বিশেষ তাৎপর্য তাঁর লেখায় যেমন মানবতার বোধ, তেমনি আছে দেশপ্রেম ও সামাজিক সম্প্রীতির সুর।
স্কুল কর্তৃপক্ষের অনেকেই ইতিমধ্যেই এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, প্রতিদিন সকালবেলার প্রার্থনায় এই গান গাওয়া হলে ছাত্রছাত্রীদের মনে রাজ্যের প্রতি একাত্মতা ও আত্মমর্যাদার বোধ গড়ে উঠবে।
সব মিলিয়ে, দীর্ঘদিনের বৈচিত্র্যের ভেতর দিয়ে এবার রাজ্যের প্রতিটি স্কুলে বেজে উঠতে চলেছে এক সুর—
“বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল...”
বাঙালিত্বের এই গানে মিশে থাকবে ইতিহাসের গর্ব, ঐক্যের আহ্বান, আর আগামী প্রজন্মের কণ্ঠে এক নতুন প্রতিশ্রুতি।