অগ্রহায়ণে নবান্নের আগমনী সুর: মাঠে শুরু ‘মুঠ পুজো’— নতুন ফসলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের গ্রামবাংলার চিরাচরিত রীতি

Story by  atv | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 6 d ago
অগ্রহায়ণে নবান্নের আগমনী সুর
অগ্রহায়ণে নবান্নের আগমনী সুর
 
শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ 

অগ্রহায়ণ মাস পড়তেই গ্রামবাংলার মাঠঘাট জুড়ে শুরু হয় সোনালি ধান কাটার তোড়জোড়। নতুন ধানের মিষ্টি সুবাসে ভরে ওঠে হেমন্তের প্রভাত। এই সময়েই কৃষক পরিবারগুলিতে পালিত হয় এক প্রাচীন, অনাড়ম্বর অথচ গভীর কৃষি-আচার— ‘মুঠ পুজো’ বা ‘মুঠি পুজো’। বহু শতাব্দী ধরে প্রচলিত এই রীতিতে নতুন ফসল ঘরে তোলার আগে দেবী লক্ষ্মীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ক্ষেত থেকে প্রথম কয়েক মুঠো ধান কাটা হয়।

গ্রামবাংলার বিশ্বাস মতে, বছরের পর বছরের পরিশ্রমে ফলানো ধান যাতে কোনো বাধা-বিপত্তি ছাড়াই ঘরে আসে, তার জন্য ‘মুঠ পুজো’ অপরিহার্য। নিয়ম অনুযায়ী, ভোরের কুয়াশা মাখা মাঠে কৃষকেরা প্রথমে আড়াই মুঠ ধান কাটেন। ধান তোলার পর কিছু ক্ষণ নীরবে প্রণাম করেন মাটিকে ও দেবী লক্ষ্মীকে। এরপর ধান মাথায় তুলে বাড়ির পথে যাত্রা শুরু হয়। এই সময় কোনো কথা বলা নিষেধ। লোকবিশ্বাস— শব্দ হলে দেবী রুষ্ট হন, আর তার প্রভাবে সারা বছরের ফসলে অকল্যাণ আসে।

মুর্শিদাবাদের বড়ঞা, সাগরদিঘীসহ জেলার বহু এলাকায় এখনও একই ভক্তিভরে পালিত হয় এই রীতি। স্থানীয় বাসিন্দা অভিজিৎ ঘোষ বলেন, “অনেক জায়গায় শহুরে প্রভাব বাড়ায় আগের মতো নিয়ম মানা হয় না। কিন্তু কিছু গ্রামে কৃষক পরিবার এখনও পুরো আচার আগাগোড়া মেনে চলে। অগ্রহায়ণের প্রথম সপ্তাহ মানেই ওসব গ্রামে মুঠ পুজোর প্রস্তুতি।”
 

বাংলায় নতুন ধানের ফসল
 
ক্ষেত থেকে আনা ধান নিয়ে কৃষক যখন বাড়ির উঠোনে পৌঁছন, তখন শুরু হয় পরিবারের যৌথ আচার। গৃহস্বামীকে দাঁড় করানো হয় একটি কাঠের পিঁড়ির উপর। গৃহবধূ মঙ্গলঘটের জল দিয়ে তাঁর পা ধুইয়ে দেন— বিশ্বাস, মাঠের ক্লান্তি ও অশুভ যেন গৃহদ্বারেই থেমে যায়। এরপর কাপড়ের আঁচলে পা মুছে তিনি প্রণাম করেন এবং ধানকে লক্ষ্মীরূপে আহ্বান জানান ঘরে প্রবেশের জন্য। সেই আড়াই মুঠ ধান ঘরের পবিত্র স্থানে রেখে শুরু হয় দুই বেলার আরাধনা। ধারণা— নিয়মমাফিক পুজো হলে ঘরে আসে শান্তি, সমৃদ্ধি ও সারা বছরের নিরাপদ ফসল।

স্থানীয় গৃহবধূ মুনমুন ঘোষ জানান, “মাঠের এক কোণে সামান্য ধান কেটে আমরা প্রথমে বাড়িতে আনি। এটাকেই দেবী লক্ষ্মীর প্রতীক ধরা হয়। এর পরেই মূল ফসল তোলা শুরু হয়।”

অগ্রহায়ণ মানেই নবান্নের মাস। সারা বাংলায় নতুন ধানের অন্ন দিয়ে নবান্ন উৎসব পালিত হলেও তার প্রথম ধাপ হল ‘মুঠ পুজো’। কৃষকদের বিশ্বাস— দেবী লক্ষ্মীর অনুমতি না নিয়ে নতুন ফসল ঘরে তোলা শুভ নয়। তাই সংক্রান্তি তিথি ঘিরে এই পুজোকেই তাঁরা বলেন— বাংলার “প্রথম লক্ষ্মীপুজো”।

সময়ের সঙ্গে বদলেছে কৃষিকাজের ধরন, জমির পরিমাণ, গ্রামীণ অর্থনীতি। কিন্তু কিছু গ্রামে মুঠ পুজোর আবহ এখনও অটুট। ভোর হতে না হতেই মাঠে যাওয়া, নীরবে ধান কাটা, আর ঘরের দরজায় দেবীর আগমন-আচার— সব মিলিয়ে এই রীতি আজও ধরে রেখেছে বাংলার কৃষিভিত্তিক সংস্কৃতির গভীর ঐতিহ্য। নতুন ফসল ঘরে তোলার এই প্রথম আচার কৃষকের মনে জাগায় নতুন বছরের আশাবাদ ও কৃতজ্ঞতা।
 

শতাব্দী প্রাচীন মুঠ পুজোর রীতি
 
মুঠ পুজো তাই শুধু একটি লোকাচার নয়; এটি কৃষকের সংগ্রাম, বিশ্বাস এবং মাটির প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধার প্রতীক— যা অগ্রহায়ণ এলেই প্রতি বছর নবজীবন পায় গ্রামবাংলার মাঠে।