বিশ্ব স্কাউটিংয়ের আলোর দিশারি: মোহাম্মদ আলি খালিদের অনন্য ও অনবদ্য অবদান

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 2 d ago
মোহাম্মদ আলি খালিদ
মোহাম্মদ আলি খালিদ
 
সানিয়া আঞ্জুম/বেঙ্গালুরু

মানবসভ্যতার ইতিহাসে প্রতিটি যুগেই এমন কিছু মানুষ জন্ম নেন, যাদের উপস্থিতি শুধু কোনও সংগঠনকে নয়, একটি প্রজন্মকে বদলে দেয়। তাঁরা ক্ষমতা বা স্বীকৃতির জন্য নন, মানুষের উন্নতি ও ঐক্যের জন্য এগিয়ে আসেন। তাঁদের চিন্তা সীমানা মানে না, তাঁদের কর্ম ভাষা–সংস্কৃতি পেরিয়ে মানুষের অন্তরে পৌঁছে যায়। আজকের মেরুকৃত পৃথিবীতে এমন পথপ্রদর্শকেরা বিরল, তবুও আছেন কিছু আলো বহনকারী, যারা অন্ধকারের মাঝেও পথ দেখান। সেই আলোকবর্তিকাদের সারিতে সবচেয়ে উজ্জ্বল নামগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ভারতের ব্রোঞ্জ উলফ অ্যাওয়ার্ড প্রাপক মোহাম্মদ আলি  খালিদ. যিনি চার দশকেরও বেশি সময় ধরে স্কাউট আন্দোলনকে শুধু এগিয়ে নেননি, বরং লক্ষ লক্ষ তরুণ–তরুণীর জীবনে মূল্যবোধ, নেতৃত্ব, মানবতা ও বৈশ্বিক ভ্রাতৃত্বের বীজ রোপণ করেছেন।
 
ভারত স্কাউটস অ্যান্ড গাইডস–এর নেতৃত্বের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ তরুণকে ঐক্যবদ্ধ করেছেন, বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব তৈরি করেছেন এবং ২৬,০০০ অংশগ্রহণকারীর ২০১৭ সালের ন্যাশনাল জ্যাম্বোরি ও ৬০,০০০ অংশগ্রহণকারীর ২০২২ সালের ইন্টারন্যাশনাল কালচারাল জ্যাম্বোরির মতো ঐতিহাসিক আয়োজন সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন। এশিয়া-প্যাসিফিকের জন্য Vision 2013 কৌশলগত পরিকল্পনা প্রণয়ন থেকে শুরু করে WOSM–এর গ্লোবাল ফি সিস্টেমে ঐক্যমত্য প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত, অনেক সময় নিজের খরচে ভ্রমণ করে কাজ করার মতো আত্মত্যাগ আর তরুণ নেতৃত্বের পরিচর্যার মাধ্যমে খালিদ প্রমাণ করেছেন যে এক মানুষের আলোর শিখাও প্রজন্মকে আলোকিত করতে পারে। 
 
একটি পুরস্কার গ্রহণের মুহূর্তে মোহাম্মদ আলি খালিদ
 
ব্যস্ততম বেঙ্গালুরুর রাস্তায়, উদীয়মান ভারতের উচ্ছ্বাসে ঘেরা পরিবেশে স্কাউটিংয়ের যে স্ফুলিঙ্গ একদিন খালিদের হৃদয়ে জেগে উঠেছিল, তা পরিণত হয় আজীবনের অগ্নিশিখায়। আশির দশকের মাঝামাঝি, মাত্র এক তরুণ স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যখন তিনি ১০ম ন্যাশনাল জ্যাম্বোরির আয়োজনের বিশৃঙ্খলার মাঝে দাঁড়িয়েছিলেন, মাঠ জুড়ে তাঁবুর সারি, দেশজুড়ে ছুটে আসা হাজারো কিশোর–কিশোরীর স্বপ্ন ও উত্তেজনায় টইটম্বুর পরিবেশ, তখনও তিনি জানতেন না যে এই অভিজ্ঞতা তাঁকে এমন এক যাত্রায় নিয়ে যাবে যা পরবর্তী চার দশকজুড়ে তাঁর জীবনকে এবং বিশ্বের লক্ষ লক্ষ স্কাউটের জীবনকে বদলে দেবে।
 
ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সংঘাতে বেড়ে ওঠা সেই মানুষটি স্কাউট প্রতিশ্রুতিকে জীবনদর্শনে পরিণত করেন, নিজের সেরাটা দেওয়া, অন্যকে সাহায্য করা এবং ঈশ্বর ও দেশের প্রতি কর্তব্য পালন। শুরুটা ছিল বিনয়ী, কিন্তু নিষ্ঠার জোরে তিনি দ্রুত নেতৃত্বে উঠে আসেন। ১৯৯৯ সালে তিনি ভারত স্কাউটস অ্যান্ড গাইডস (BSG)-এর নির্বাহী কমিটির সদস্য হন, এমন এক সংগঠন, যার সদস্য সংখ্যা আজ ৬৩ লক্ষেরও বেশি, যা WOSM–এ সদস্যসংখ্যায় ইন্দোনেশিয়ার পর দ্বিতীয়। ক্ষমতা বা পদ তাঁর লক্ষ্য ছিল না; তিনি বিশ্বাস করতেন স্কাউটিং তরুণ মনকে গড়ে তোলে। “Once a Scout, always a Scout”, এই মন্ত্র তাঁকে পথ দেখিয়েছে, এমনকি যখন তিনি টানা ২৪ বছর নিজ খরচে জাতীয় সেবা করেছেন।
 
একটি পুরস্কার গ্রহণের মুহূর্তে মোহাম্মদ আলি খালিদ
 
জাতীয় স্তরেও তাঁর কাজ ছিল পরিবর্তন-সৃষ্টিকারী। ২০০৩ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত ফাইন্যান্স রিসোর্স কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি BSG–কে সুদৃঢ় অর্থনৈতিক ভিত্তি উপহার দেন, যাতে স্বেচ্ছাসেবীদের ওপর চাপ না বাড়িয়ে সংগঠনের কর্মসূচি সমৃদ্ধ হয়। কিন্তু ২০১1–২০১৭ সালে ইন্টারন্যাশনাল কমিশনার হিসেবে তাঁর নেতৃত্ব ছিল ইতিহাস–গড়া। এই সময় তিনি এশিয়া–প্যাসিফিক অঞ্চলের এবং বিশ্বের অন্যান্য NSO–র সঙ্গে দৃঢ় অংশীদারিত্ব গড়ে তোলেন। তাঁর কূটনৈতিক দক্ষতা প্রতিদ্বন্দ্বীদেরও সহযোগিতায় পরিণত করে, আর এটিই BSG–এর “সবচেয়ে সেরা আন্তর্জাতিক সংযোগের সময়” হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
 
২০১৭ সালের ১৭তম ন্যাশনাল জ্যাম্বোরিতে তাঁর নেতৃত্ব এক নতুন দিগন্ত তৈরি করে, ২৬,০০০ অংশগ্রহণকারী ও আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিত্বসহ এটি ছিল ভারতের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ স্কাউট সমাবেশ। সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে বিশ্ব স্কাউট আদর্শের সঙ্গে একসূত্রে গেঁথে তিনি এমন অভিজ্ঞতা সৃষ্টি করেন যা অংশগ্রহণকারীদের মনে আজও অমলিন। তার থেকেও বড় সাফল্য ছিল ২০২২ সালের ইন্টারন্যাশনাল কালচারাল জ্যাম্বোরি, কোভিডের অন্ধকার সময়ে জন্ম নেওয়া এই প্রয়াসে ৬০,০০০ কিশোর–কিশোরী অংশ নেয় এবং স্কাউটিংয়ের অদম্য শক্তিকে তুলে ধরে। খালিদের ভাষায়, “এক বিশ্ব যখন বিচ্ছিন্নতায় দগ্ধ, আমরা তখন গল্প ও হাসির সেতু গড়েছি।”
 
মোহাম্মদ আলি খালিদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের সঙ্গে
 
দেশের বাইরে তাঁর কাজও ছিল স্বপ্নদর্শী নেতৃত্বের এক উজ্জ্বল উদাহরণ। ১৯৯৫ সাল থেকে প্রায় তিন দশক তিনি এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের কৌশলগত পরিকল্পনা ও সংস্কারে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখেন। ১৯৯৫–১৯৯৮ সালে আঞ্চলিক স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যানিং টাস্ক ফোর্সের ভাইস-চেয়ারম্যান এবং ২০০১ পর্যন্ত চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি Vision 2013 পরিকল্পনার নেতৃত্ব দেন, যা তরুণ নেতৃত্ব, টেকসই উন্নয়ন ও বৈশ্বিক লক্ষ্যকে এক ছাতার নিচে নিয়ে আসে। এই পরিকল্পনা শুধু নথি ছিল না, এটি সম্পদস্বল্প দেশের NSO–দের বিকাশ ও বিস্তারের বাস্তব পথ দেখায়।
 
২০০৫ সালে টিউনিশিয়ার হাম্মামেতে ওয়ার্ল্ড স্কাউট কনফারেন্সে রেজোলিউশন কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে আন্তর্জাতিক জটিলতা সামলাতে তাঁর কূটনীতি ছিল অসাধারণ, সব প্রস্তাবই সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। একই বছরে বেঙ্গালুরুতে দ্বিতীয় World Scout Seminar on Partnership আয়োজনেও তিনি নেতৃত্ব দেন, যার ফলশ্রুতিতে “Marrakech Charter – Bangalore Edition” তৈরি হয়, যা WOSM–এর কমিউনিকেশন ও এক্সটার্নাল রিলেশন কৌশলের ভিত্তিস্তম্ভে পরিণত হয়।
 
মোহাম্মদ আলি খালিদ একটি ব্যক্তির সঙ্গে
 
২০১৪–২০১৭ সালে WOSM-এর Registration Fees and Voting System Task Force–এ কাজ করা ছিল আরও এক বড় অর্জন। আর্থিকভাবে বৈচিত্র্যময় APR অঞ্চলের দেশগুলোকে একমত করা ছিল সংঘাতপূর্ণ কাজ, কিন্তু খালিদের নিরপেক্ষতা ও সহানুভূতিশীল যোগাযোগের ফলে বহু বছরের অচলাবস্থা দূর হয়। নরওয়ে ও ম্যানিলার ফোরামে খসড়া উপস্থাপন থেকে শুরু করে সদস্যদের আশঙ্কা নিরসন, সবই করেছেন তিনি নীতির সঙ্গে আপস না করে।
 
২০১৬ সাল থেকে তিনি WOSM GSAT ফ্যাসিলিটেটর হিসেবে বিভিন্ন NSO–কে গভার্নেন্স ও পরিচালনায় শক্তিশালী করতে সহায়তা করে আসছেন। ২০০৮–২০১১ সালে ২৬ দেশের মধ্যে ১৩টি NSO পরিদর্শনকালে তিনি প্রত্যক্ষ করেন, ভুটানের পরিবেশ সচেতনতা কর্মসূচি, মালদ্বীপের দুর্যোগ–সহনশীলতা উন্নয়ন, এবং সীমাবদ্ধ সম্পদের মধ্যেও স্কাউট আন্দোলনের অসীম সম্ভাবনা। এই উপলব্ধিই তাঁকে SAANSO (South Asian Association of National Scout Organizations) প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা নিতে উদ্বুদ্ধ করে, যা ২০১০ সালে SAARC সেক্রেটারিয়েটে নিবন্ধিত হয় এবং আজও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে স্কাউটিংয়ের মাধ্যমে কাছাকাছি এনে চলেছে।
 
মোহাম্মদ আলি খালিদ একটি ব্যক্তির সঙ্গে
 
৭০ বছর বয়সেও তাঁর গতি থেমে যায়নি। ২০২০ সাল থেকে Additional Chief National Commissioner হিসেবে তিনি নির্বাহী কমিটি তদারক করছেন, সুযোগ্য নেতৃত্ব মনোনয়ন দিচ্ছেন, সংগঠনের আর্থিক ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করছেন এবং ২০২৪ সালের মধ্যে সদস্য সংখ্যা ২০% বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করছেন। তরুণদের অন্তর্ভুক্তি তাঁর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য, যাতে নির্বাহী কমিটিতে এক-তৃতীয়াংশ এবং আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে ৫০% অংশগ্রহণ তরুণদের হয়। পাশাপাশি তিনি ২০২২ সাল থেকে WOSM Youth Engagement Task Force–এর সদস্য হিসেবে বৈশ্বিক নীতি–নির্ধারণে তরুণ কণ্ঠস্বর প্রতিষ্ঠার আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন।
 
পুরস্কারের তালিকা তাঁর কর্মজীবনের সাফল্য তুলে ধরলেও তিনি অর্জন মাপেন মানুষের জীবনে পরিবর্তন এনে। ২০১০ সালের BSA Silver World Award, ২০০১ সালের APR Chairman’s Award, ২০১২ সালের APR Distinguished Service Award, এবং ১৯৯৪ সালের ভারতের Silver Elephant অ্যাওয়ার্ড তাঁর ঝুলিতে থাকলেও তিনি সবচেয়ে বেশি গর্ববোধ করেন সেই অসংখ্য তরুণ নেতৃত্বের বিকাশে, যাদের তিনি সঠিক হাতে পৌঁছে দিয়েছেন। নিজ খরচে ভ্রমণ ও সেবা দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, স্কাউটিং মানেই আত্মত্যাগ।
 
মোহাম্মদ আলি খালিদ তাঁর একজন সহকর্মীর সঙ্গে
 
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর অবদান অসাধারণ। তিনি ভারতের স্কাউটিংয়ের “মুখ” হিসেবে স্বীকৃত, যিনি বৈশ্বিক কৌশল ও আঞ্চলিক বাস্তবতাকে সমন্বয় করেন, ১.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সরকারি অনুদান সংগ্রহ করেন এবং অর্থনৈতিক সংকটের সময় APR Scout Foundation–কে World Scout Foundation–এর সঙ্গে যুক্ত করার মতো দূরদর্শী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, যা তহবিলকে স্থিতিশীলতা দেয়। ৬৩ লক্ষ সদস্যের নেতৃত্বের মাধ্যমে তিনি পরোক্ষভাবে কোটি মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলেছেন, বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য গড়ে তুলে। তাঁর উদ্যোগে APR পুরস্কার ব্যবস্থার সংশোধন ও Meritorious Contribution Award চালু হওয়ায় অসংখ্য নিঃস্বার্থ কর্মী স্বীকৃতি পেয়েছেন, যা নতুন প্রজন্মকে যোগ দিতে অনুপ্রাণিত করেছে।
 
মোহাম্মদ আলি খালিদের জীবন শান্ত অথচ বিপ্লবী পরিবর্তনের কাহিনি, প্রতিটি চ্যালেঞ্জকে সুযোগে পরিণত করার গল্প। বিভক্ত পৃথিবীতে তিনি মনে করিয়ে দেন, স্কাউটিং শুধু কার্যক্রম নয়; এটি মানবিকতার স্কুল, সহমর্মিতার পাঠশালা, চরিত্র গঠনের প্ল্যাটফর্ম। ব্রোঞ্জ উলফ গ্রহণের প্রস্তুতিকালে তাঁর শিখাটি আজও দীপ্তিমান, প্রমাণ করে যে এক মানুষের নিষ্ঠা প্রজন্মকে আলোকিত করতে পারে। তাঁর যাত্রা শেষ নয়, এই আগুন আরও বহু পথ আলোকিত করবে।