মনসুরউদ্দিন ফারিদি,নয়াদিল্লি ঃ
ইতিহাস, সঙ্গীত এবং আধ্যাত্মিকতার সুর মিলিয়ে মনোমুগ্ধকরভাবে আধুনিক গল্প বলা খুব কমই দেখা যায়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকজন শিল্পী এই বিরল শিল্পকে জীবিত রেখেছেন। সেই শিল্পীদের অগ্রভাগে রয়েছে সৈয়দ সাহিল আগার নাম। দিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার গলি থেকে শুরু হওয়া আগার যাত্রা আজ দেশ–বিদেশের মঞ্চে গল্প বলা (দাস্তানগো)–র এক বিশিষ্ট দূত হিসেবে পরিচিত।
দিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রজীবনে থাকার সময়ই সৈয়দ সাহিল আগার গল্পকথনের প্রতি আগ্রহের বিকাশ ঘটে।তিনি বলেন, গল্পকথনের যে দিকটি তাঁর সবচেয়ে ভালো লাগে, তা হলো এটি সুফি ও খানকাহের সঙ্গে সম্পর্কিত; এটি শান্তি ও ভালোবাসার বার্তা পৌঁছে দেওয়ার একটি মাধ্যম, যা দেশপ্রেম, ঐক্য ও ধর্মীয় সম্প্রীতি জাগ্রত করে এবং গঙ্গা–যমুনার সভ্যতাকে লালন করেন।
এক অনুষ্ঠানে সৈয়দ সাহিল আগা
আজ তিনি দেশ-বিদেশে গল্পকথনের অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। “আমি আনন্দিত এবং তৃপ্ত, কারণ এই শিল্প আমাকে আত্মিক প্রশান্তি দেয়,” বলেন ভারতের বিশিষ্ট গল্পকার।১৯৮২ সালে জন্ম নেওয়া সৈয়দ সাহিল আগা জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া, দিল্লি থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন এবং পরে দিল্লির শ্রী রাম সেন্টার অব পারফর্মিং আর্টস থেকে অভিনয়ে স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমা লাভ করেন।তাঁর বাবা সৈয়দ মনসুর আগা একজন অভিজ্ঞ উর্দু সাংবাদিক হলেও, সাহিল আগা গল্পকথনের জগতে নিজের পরিচিতি তৈরি করেছেন।
তিনি বলেন, “আমি বুঝতে পারলাম মানুষ পড়ার চেয়ে শোনা বেশি পছন্দ করে, তাই ভাবলাম গল্পগুলো বলা উচিত, যাতে মানুষ অতীত সম্পর্কে জানতে পারে এবং সেখান থেকে শিক্ষা নিতে পারে।”
আকর্যণীয় বিষয় হলো, তিনি প্রথমে দাস্তান-এ-হিন্দ নামে একটি বই লেখেন। পরে সেই বইয়ের গল্পগুলো ভিডিও আকারে উপস্থাপন করেন। প্রথমে তিনি লেখক হিসেবে পরিচিতি পান এবং অচিরেই গল্পকথনে পা রাখেন।
এক অনুষ্ঠান চলাকালীন সৈয়দ সাহিল আগা এবং অন্যান্য শিল্পীরা
যদিও ভারতে গল্পকথনের ঐতিহ্য বহু শতাব্দী পুরোনো, ১৯২৮ সালে মীর বাকর আলীর মৃত্যুর পর এই শিল্প প্রায় বিলুপ্ত হয়ে পড়েছিল। তবে ২০০৫ সালে শামসুর রাহমান ফারুকি, নাসিরউদ্দিন শাহ এবং মাহমুদ ফারুকি এই ঐতিহ্যকে পুনর্জীবিত করেন, তিনি বলেন।
সৈয়দ সাহিল আগার লক্ষ্য শুধুমাত্র গল্প বলা নয়, বরং ভারতীয় সভ্যতাকে প্রচার করাও। তিনি সেইসব শিল্পীদের মধ্যে একজন, যারা এই প্রাচীন শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করেছেন এবং জনপ্রিয় করে তুলেছেন; অভিজাত ও সাহিত্যপ্রেমীদের ছোট পরিসর থেকে তিনি এই শিল্পকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।
এছাড়া তিনি ঐতিহ্যবাহী গল্পকথনের একটি নতুন ধরন চালু করেন। তিনি “মিউজিক্যাল স্টোরিটেলিং”-এর ধারণা দেন, যেখানে ভারতীয় অপেরা ও শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সাথে গল্পকে মিলিয়ে উপস্থাপন করা হয়। এই পরীক্ষামূলক ধারা মানুষের কাছে বেশ গ্রহণযোগ্য হয় এবং নতুন প্রজন্মের জন্য গল্পকথনকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।
সৈয়দ সাহিল আগা এবং তাঁর অনুষ্ঠানের পোস্টার
সৈয়দ সাহিল আগা দেশ-বিদেশে বহু গল্প উপস্থাপন করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে দাস্তান-এ-মহবুব-এ-ইলাহী, দাস্তান-এ-আমীর খুসরো, দাস্তান-এ-গালিব, দাস্তান-এ-দাগ, দাস্তান-এ-মীর, দাস্তান-এ-শোয়েব আখতার, জশ্ন-এ-জাভেদ আখতার, দিল্লির কবিদের গল্প, দাস্তান-এ-আখরি দাস্তাঙ্গো, দাস্তান-এ-তাকসিম, দাস্তান-এ-ইশক, দাস্তান-এ-ফাতেহ, দাস্তান-এ-সুলতান সালাহউদ্দিন প্রভৃতি।
তিনি টেলিভিশনেও কাজ করেছেন। তিনি ডিডি উর্দুর জন্য গালিব আমরাও বেগম নামে একটি বিশেষ অনুষ্ঠান লিখে উপস্থাপন করেন। এছাড়া তিনি জি সালামের জন্যও গল্প বলেছেন, যা ধারাবাহিকভাবে প্রচারিত হয়েছিল।
মঞ্চে সৈয়দ সাহিল আগা
সৈয়দ সাহিল আগা টেলিভিশনেও অভিনয় করেছেন। তিনি ডি ডি উর্দুর জন্য গালিব আমরাও বেগম নামে একটি বিশেষ অনুষ্ঠান লিখে উপস্থাপন করেছিলেন। তিনি জি সালামের জন্যও গল্প লিখেছিলেন, যা একটি বিস্তৃত ধারাবাহিক হিসেবে সম্প্রচারিত হয়েছিল। টেলিভিশনের বাইরেও তিনি বলিউডের পরি খানাহ এবং সানাম খানাহ চলচ্চিত্রের জন্য রচনাকর্ম করেছেন।
তিনি বলেন, ঘৃণা মানুষকে শুধু যন্ত্রণা ও দুঃখ-কষ্ট দেয়, যা সাময়িক। কারণ ভালোবাসার অনুভূতি সবার হৃদয়েই বিদ্যমান।
সাহিল বলেন, “যখন আমি মঞ্চ থেকে নিচে নামি, জাতি–ধর্ম নির্বিশেষে সবাই আমাকে আলিঙ্গন করে। এটি অত্যন্ত উৎসাহব্যঞ্জক এবং মনে এই বিশ্বাস জাগায় যে আমি যা করেছি, তা ভালো কাজ ছিল।”
সাহিল আগার আরেকটি নেশা হলো পুরোনো (ভিনটেজ) গাড়ি সংগ্রহ করা। একসময় যেগুলো রাজা–নবাবদের ছিল, এমন গাড়িসহ বর্তমানে তাঁর সংগ্রহে মোট ৫০টি অক্ষত পুরোনো গাড়ি রয়েছে।