২০১০ সালের ৯ জুলাই মাইসোরে জন্ম নেওয়া রিফাহর পরিবেশে রয়েছে রাজপ্রাসাদের ইতিহাস আর ইঞ্জিনের গর্জন। তাঁর মা বি.বি. ফাতিমা, বাড়া মাকান সরকারি উর্দু উচ্চ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। বাবা তাজউদ্দিন, একসময়ের গাড়ি ও টু-হুইলার রেসার, এখন হোটেল ব্যবসায় সফল। বড় বোন শিফা সাহার বিয়ের পর রিফাহই হয়ে ওঠেন পরিবারের স্বপ্নের প্রদীপ। বর্তমানে সেন্ট অ্যান’স স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্রী, কিন্তু বয়সের তুলনায় তিনি অনেক বড়, এক নতুন প্রজন্মের শক্তি।
আন্তর্জাতিক রেসার হওয়ার অসম্পূর্ণ স্বপ্ন তাড়িয়ে বেড়াত তাজউদ্দিনকে। তিনি চেয়েছিলেন তাঁর প্যাশন উত্তরাধিকারী হওয়ার মতো এক পুত্রসন্তান। কিন্তু তিনি পেলেন রিফাহর মতো এক বিস্ময় প্রতিভা। সাত বছর বয়সেই সে অভিজ্ঞ চালকের মতো গাড়ি চালাত। তিন বছর বয়সে বাবার পরিবর্তিত বিশেষ গাড়িটি রপ্ত করে ফেলে। পাঁচ বছর বয়সে মাইসোর থেকে বেঙ্গালুরু পর্যন্ত নিখুঁতভাবে গাড়ি চালিয়ে তাক লাগিয়ে দেয়। ছ’ বছর বয়সে বান্নিমান্টাপের সেন্ট জোসেফ স্কুলের অনুষ্ঠানে স্টান্ট ও ড্রিফট দেখিয়ে মুগ্ধ করে দেয় সকলকে।
তাজউদ্দিন তাঁর জন্য তৈরি করেন এক বিশেষ "বগ্গি", একটি চতুষ্পদ ছোট বাইক। ২০১৭ সালের ২৬ জানুয়ারি, প্রজাতন্ত্র দিবসে সাত বছরের রিফাহ যখন স্কুলে শো-এর মঞ্চ দাপিয়ে বেড়াল, তখনই স্পষ্ট হয়ে যায়, সে ভাঙবে সব বাঁধা।
মহত্ত্ব পেতে লাগে অধ্যবসায়। বোন শিফা চেয়েছিলেন রিফাহর প্রতিভা সংবাদমাধ্যমের সামনে আসুক, কিন্তু বয়স কম বলে সংবাদপত্রগুলো গুরুত্ব দিচ্ছিল না। তখনই নাগেশ নামের এক যুবক তাঁদেরকে ২০১৭ সালে এক শীর্ষ মহিলা সাংবাদিকের সাথে যুক্ত করেন। সেই প্রথম প্রবন্ধই বদলে দিল সবকিছু। অক্টোবরে আরও একটি সংবাদ প্রকাশ হতেই একঝলকে বিখ্যাত হয়ে ওঠেন রিফাহ।
রিফাহ তাসকিন
বিশ্বরেকর্ডের পথ ছিল কঠিন। কাগজপত্রের প্রাথমিক অনুমোদন মিললেও বয়সের কারণে আরটিও ও সরকারি দপ্তরগুলো অনুমতি দিচ্ছিল না। পরিবারের নিরলস প্রচেষ্টায়, মন্ত্রী থেকে বিভিন্ন দপ্তরের দরজায় কড়া নেড়ে অবশেষে এগোতে থাকেন তাঁরা। প্রয়াত এমএলএ বাসু ঘোষণা করেছিলেন, “এই মেয়ের জন্য জেলেও যেতে রাজি, আমি সব অনুমতি এনে দেব।”
পুলিশ কমিশনার এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর সহায়তায় স্কুলের একটি পরীক্ষামূলক ড্রাইভ পাস করে রিফাহ। ২০১৭ সালের ৫ নভেম্বর ঈদগাহ গ্রাউন্ডে (তিলক নগর) লরি-সহ একাধিক যানবাহন চালিয়ে গোল্ডেন বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস অর্জন করে, আর মাইসোরের প্রথম সারির সংবাদমাধ্যম তাঁরই কথা লিখল।
‘চিন্নারা দশরা’র প্রধান অতিথি হিসেবে রিফাহর অংশগ্রহণ, তাঁর ভাইরাল ছবি, সবই ডেপুটি কমিশনারকে বিশেষ অনুমতি দিতে বাধ্য করে। জে.কে গ্রাউন্ডে বাইক রাইড দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু করলে আবারও ঝড় তোলে সংবাদমাধ্যমে।
সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে রিফাহ তাসকিন
রেসিংয়ের বাইরে গিয়েও তাঁর অবদান বিস্ময়কর, টানা পাঁচ বছর মাইসোর সিটি কর্পোরেশনের পরিছন্নতা অ্যাম্বাসাডর এবং চার বছর ধরে রাজ্য পর্যায়ে টিবি সচেতনতার দূত। ২০২৫ সালে তাঁকে দেওয়া হবে টিপু সুলতান অ্যাওয়ার্ড।
২০১৯ সালে রাহুল গান্ধীর আমন্ত্রণে তিনি তাঁর সঙ্গে দেখা করেন। সোনিয়া গান্ধী তাঁকে যে সম্মান দিয়েছেন, মা বি.বি. ফাতিমার মতে, তার তুলনা নেই। সোনিয়া জিজ্ঞাসা করেছিলেন তাঁর স্বপ্ন কী? রিফাহ উত্তর দেয়, “ফাইটার পাইলট।” সোনিয়ার সুপারিশে মাত্র আট বছর বয়সেই জাক্কুর অ্যারোড্রোমে দুই সিটের বিমান ওড়ানোর সুযোগ পান তিনি।
মাইসোরে ভারত জোড়ো যাত্রার সময় তাঁকে আবারও দেখা করেন রাহুল গান্ধী। রিফাহ একটি দারুণ ড্রিফট দেখালে রাহুল উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন, এ যেন সাহস ও ঐক্যের প্রতীক। পুরো পথটাই ছিল সম্পূর্ণ স্ব-অর্থায়নে। মা ফাতিমাই দেখেন তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া, প্রচার করেন অনুপ্রেরণাদায়ক কর্মকাণ্ড। ব্র্যান্ড প্রমোশন এবং বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে রিফাহ প্রমাণ করেছে, প্রতিভার কোনো সীমা নেই।
রাহুল গান্ধীর সঙ্গে রিফাহ তাসকিনের একটি ছবি
তিনি এখন সাতটি বিশ্বরেকর্ডের অধিকারী, গোল্ডেন বুক, এলিট বুক, হাই রেঞ্জ বুক, ইন্ডিয়া বুক, এশিয়া বুক, ওয়ার্ল্ডওয়াইড বুক এবং ওয়ান্ডার বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস। তিনি চালাতে পারেন, বাইক, লম্বা গঠনবিশিষ্ট বিশেষ বাইক, জেসিবি, টিপার, ডোজার, রোড রোলার, ক্রেন, কার, বাস, এসইউভি, এমনকি বিমানও (আট বছর বয়সে)।
যানবাহনই তাঁর সীমা নয়, যুদ্ধক্রীড়াতেও দুর্ধর্ষ রিফাহ। তিনি, রাজ্যস্তরে বক্সিংয়ে তৃতীয় স্থান অধিকারী, জাতীয় পর্যায়ে ক্যারাটে প্রতিযোগী, সম্প্রতি শিমোগার রাজ্য বক্সিংয়ে উজ্জ্বল পারফর্মার। ২০২৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর কেরালার কোচির লে মেরিডিয়েনে পিএম ফাউন্ডেশনের পুরস্কার পাবেন তিনি।বিশ্বব্যাপী তাঁর গল্প প্রভাব ফেলেছে। আলিনা ও আলিজাহের মতো অ্যাথলিটরা তাঁর অনুপ্রেরণায় থাইল্যান্ডে তায়কোয়ান্দোতে পদক জিতে তাঁকে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানান।
রাহুল গান্ধীর সঙ্গে রিফাহ তাসকিন ও তার পরিবার
বাড়িতে মিষ্টি বিতর্ক, মা-বাবা চান তিনি চার চাকার রেসার হন, আর রিফাহ চান বাইক রেসিংয়ে শীর্ষে উঠতে।
শেষ স্বপ্ন?, আইএএস কর্মকর্তা হয়ে দেশের জন্য কাজ করা। এসএসএলসি-র পর তাঁর লক্ষ্য আরও ৪–৫টি বিশ্বরেকর্ড, টায়ার ছাড়া গাড়ি চালানো, স্টিয়ারিং ছাড়াই ড্রাইভ, সিনেমার মতো দুই চাকার ওপর ১৫ কিমি ব্যালেন্স, এক লাফে ১০টি গাড়ির ওপর দিয়ে গাড়ি উড়িয়ে নেওয়া, সবই তাঁর সাহসী পরিকল্পনা।
রিফাহ তাসকিন শুধু গাড়ি চালান না, তিনি পরিবর্তন চালান। তিন বছরের ক্ষুদে চালক থেকে ১৫ বছরের সাহসী, পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্য-দূত হওয়া পর্যন্ত তাঁর গল্প প্রমাণ করে, স্বপ্ন বয়স মানে না, নিয়ম মানে না। স্বপ্ন এগিয়ে যায় হৃদয়ের জোরে, দৃঢ়তায় এবং সীমাহীন গতিতে। আর যখন পৃথিবী বলে, “তুমি খুব ছোট,” রিফাহ তখন গর্জে ওঠে, “দেখো আমাকে।”