পশমাণ্ডা মিশন: সামাজিক পরিবর্তন আনার জন্য মুহাম্মদ মেরাজ রায়ীন-এর অভিনব উদ্যোগ

Story by  atv | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 13 d ago
মহম্মদ মেরাজ রায়ীন
মহম্মদ মেরাজ রায়ীন

মালিক আসগার হাসমি , নয়া দিল্লি : 

‘শুধু রাজনীতি দিয়ে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।’— এই বিশ্বাসে পরিচালিত হয়ে মহম্মদ মেরাজ রায়ীন এক বছর আগে ‘পসমাণ্ডা বিকাশ ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেই সময় থেকে এই সংগঠনটি ভারতের মুসলিম জনসংখ্যার প্রায় ৮০ শতাংশ অংশীদার পসমাণ্ডা মুসলমানদের জীবনমান উন্নত করার পাশাপাশি তাদের মধ্যে আশা জাগানো এবং আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে আসছে। ‘আওয়াজ দ্য ভয়েস’-এর সঙ্গে সাক্ষাৎকারে রায়ীন এই কথা জানান।

রাজনৈতিক প্রচেষ্টায় সীমাবদ্ধ থাকা গোষ্ঠীগুলোর বিপরীতে এই ফাউন্ডেশনটি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের মতো মূল বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেয়। রায়ীনের বিশ্বাস, পসমাণ্ডাদের জন্য অর্থবহ অগ্রগতি সম্ভব কেবল সামষ্টিক জাগরণ এবং সহযোগিতার মাধ্যমে, বিশেষ করে আশরাফ শ্রেণির অংশগ্রহণে। পসমাণ্ডা আন্দোলনকে আশরাফ অভিজাতদের বিরোধিতা করে বলে যে প্রচলিত ধারণা আছে তা ভেঙে দিয়ে রায়ীন আশরাফ সম্প্রদায়ের মানুষদেরও সংগঠনে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তাঁর লক্ষ্য পসমাণ্ডা সমাজকে রাজনৈতিক ভোটব্যাংক হিসেবে গড়ে তোলা নয়, বরং তাদেরকে আত্মনির্ভরশীল ও শক্তিশালী সমাজ হিসেবে গড়ে তোলা।
 

স্থানীয় মানুষের সঙ্গে মহম্মদ মেরাজ রায়ীনের  স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের এক দৃশ্য

মূলত বিহারের বৈশালী থেকে আসা মেরাজ রায়ীন পরে দিল্লিতে চলে আসেন, যেখানে তিনি স্ত্রী নীখাত পারভীনের সঙ্গে এই প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি মোটরসাইকেলের যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারক একটি কারখানা পরিচালনা করেন, যার কারণে তাঁকে নিজের কর্মজীবনের দায়িত্ব, পারিবারিক জীবন এবং সমাজসেবার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়। ফাউন্ডেশনের নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি রায়ীন ড. ইজাজ আলীর অল ইন্ডিয়া মুসলিম ফোরাম-এর সদস্য এবং বিজেপি সংখ্যালঘু মোর্চার কার্যনির্বাহী সমিতির সদস্য। তিনি নিজের রাজনৈতিক ব্যস্ততাকে তাঁর সামাজিক মিশনের সঙ্গে একত্রিত করে চলেন।

সম্প্রতি, ফাউন্ডেশনটি জামিয়াত উলেমা-ই-হিন্দের মাদনী হলে মাদ্রাসাগুলিতে আধুনিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে ‘কওমি তালিমি বেদারি সম্মেলন’-এর আয়োজন করে। এই অনুষ্ঠানে পাঁচটি মাদ্রাসার ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে কম্পিউটার কিট বিতরণ করা হয়। জামিয়াত উলেমা-ই-হিন্দের সাধারণ সম্পাদক মৌলানা হাকিমুদ্দিন কাসমী এই পদক্ষেপের প্রশংসা করেন এবং রায়ীনকে স্বাস্থ্যসেবার দিকেও গুরুত্ব দিতে আহ্বান জানান। তিনি বলেন, শিক্ষা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, স্বাস্থ্যও ততটাই জরুরি, কারণ শুধু একজন সুস্থ নাগরিকই জাতি গঠনে অবদান রাখতে পারে।
 

ইন্ডিয়া গেটে মহম্মদ মেরাজ রায়ীন

রায়ীন দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে আধুনিক শিক্ষাই পসমাণ্ডা সম্প্রদায়ের উন্নতির চাবিকাঠি। তাঁর পরবর্তী উদ্যোগ হল হরিয়ানার নুহ জেলার ৩৫০টি মাদ্রাসার ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে কম্পিউটার কিট বিতরণ করা, যাতে ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাব্যবস্থা এবং আধুনিক প্রযুক্তির মধ্যে ব্যবধান দূর করা যায়। তিনি বলেন, এর ফলে নতুন কর্মসংস্থানের পথ খুলে যাবে এবং দেশের তরুণ পসমাণ্ডাদের জন্য একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ তৈরি হবে।

এই ফাউন্ডেশনটি শিক্ষা, আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, আইনি সহায়তা, দক্ষতা উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা এবং সমাজকল্যাণসহ বহু ক্ষেত্রকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। তারা ছাত্রছাত্রীদের বৃত্তি ও ক্যারিয়ার পরামর্শ প্রদান করে, যুবক-যুবতীদের নিজস্ব উদ্যোগ শুরু করতে সহায়তা করে, সামাজিক বা আইনি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়া ব্যক্তিদের আইনি সহায়তা দেয় এবং প্রশিক্ষণ কর্মসূচি ও স্বাস্থ্য উদ্যোগের আয়োজন করে। এই বহুমুখী প্রচেষ্টার মাধ্যমে ফাউন্ডেশনটি শুধুমাত্র একটি অলাভজনক সংস্থা নয়, বরং একটি আন্দোলনে পরিণত হয়েছে।
 

মহম্মদ মেরাজ রায়ীনের জাতীয়তাবাদ অভিযান

রায়ীন নারী ও পুরুষের পৃথক দুটি দলকে নেতৃত্ব দেন। এই ফাউন্ডেশনের গাইডেন্স বোর্ডে আছেন আকরাম হুসাইন কাসমী, দারুল উলুম দেওবন্দের মুফতি মেহবুব রহমান কাসমী, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আফতাব আলম আনসারি এবং ড. খাদিজা তাহেরা, পাশাপাশি সমাজকর্মী আব্দুস সালাম ও সাইয়দ ফারুক শায়ারের মতো বিদ্বজ্জন। উল্লেখযোগ্যভাবে, দলিত মুসলিম হালালখোর কল্যাণ পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা মুর্তুজা আলমও এই দলে যোগ দিয়ে পসমাণ্ডা–দলিত সম্প্রীতি আরও দৃঢ় করেছেন।

অঞ্জুম আরা সুলতানা ও অ্যাডভোকেট ফারা মির্জার নেতৃত্বে মহিলা শাখা কর্মশালা ও সেমিনারের আয়োজন করে নারীদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেয়।