“এক ছাত্র, এক সংকল্প, এক পরিবর্তন: উভাইস আলি খানের অনুপ্রেরণামূলক পথচলা”

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 12 d ago
উভাইস আলি খান
উভাইস আলি খান
 
বিদুশী গৌর / নয়া দিল্লি

উত্তর প্রদেশের পশ্চিমাঞ্চলের এক সাধারণ ছেলেটি, উভাইস আলি খান, একদিন বড় কিছু করার স্বপ্ন দেখেছিলেন। তাঁর গল্প শুরু হয়েছিল বিজনোর জেলার কিরতারপুরের সাধারণ পরিবেশ থেকে। “আমার পড়াশোনায় কোনো দিকনির্দেশনা ছিল না,” তিনি স্মরণ করেন। “১২শ শ্রেণি পাশ করার পর আমি জানতামই না কোন পথে এগোব।”
 
বড় ভাইয়ের সঙ্গে থাকতে দিল্লিতে আসার পরেই তাঁর জীবনে দিশা মিলতে শুরু করে। প্রথমে আইন পড়ার ইচ্ছে থাকলেও, ভাগ্যক্রমে তাঁর নজরে পড়ে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্সি কোর্স, এবং তিনি চেষ্টা করে দেখার সিদ্ধান্ত নেন। আজ তিনি একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট, যাঁর যাত্রা অধ্যবসায় ও লক্ষ্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং ২০০৭ সালে সিএ হিসেবে যোগ্যতা অর্জন করেন।
 
উভাইস আলি খান
 
কিন্তু পথটা সহজ ছিল না। প্রথমবার সিএ ফাইনালে ব্যর্থ হলে অনেকেই হাল ছেড়ে দিতেন। কিন্তু উভাইস আরও কঠোর পরিশ্রম শুরু করেন, প্রতিদিন ২২ ঘণ্টা পর্যন্ত পড়াশোনা করতেন। শেষ পর্যন্ত তাঁর পরিশ্রম ফল দেয়: ২০১২ সালে তিনি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন, এমনকি ট্যাক্সেশনে অল ইন্ডিয়া টপারও হন।
 
“আমি স্কুলে কখনোই অসাধারণ ছিলাম না,” তিনি স্বীকার করেন। “কিন্তু যখন সত্যিই জরুরি ছিল, তখন সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করেছি। কঠোর পরিশ্রম সত্যিই ভাগ্য বদলে দেয়।” সেই সাফল্যের সঙ্গে তিনি তাঁর শহরের প্রথম চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টও হয়ে ওঠেন। 
 
পেশাগত সাফল্য এলেও তাঁর মনে কোথাও যেন অপূর্ণতা রয়ে গিয়েছিল। “আমি শুধু নিজের জীবিকা নির্বাহ নয়, আরও কিছু করতে চেয়েছিলাম,” তিনি বলেন। “আমি অন্যদের জন্য সুযোগ তৈরি করতে চেয়েছিলাম।” তাই তিনি স্থায়ী চাকরি ছেড়ে দিলেন এবং দিল্লির লক্ষ্মী নগরের এক ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্ট থেকে নিজের ব্যবসা শুরু করলেন। বন্ধু ও ব্যাংক থেকে ধার নিয়ে তিনি শুধু একটি কোম্পানি নয়, বরং পরিবর্তনের এক প্ল্যাটফর্ম গড়তে শুরু করেন।
 
উভাইস একটি সহজ কিন্তু শক্তিশালী বিশ্বাসে আস্থা রাখেন: “মৌলিক দক্ষতা শেখাতে পারলে মানুষের সামনে কর্মসংস্থানের পথ খুলে যায়, আর একটিমাত্র সুযোগও একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে।” অল্পদিনেই তাঁর অফিস হয়ে ওঠে শেখার এক কেন্দ্র। তাঁর মতোই দিশেহারা তরুণ-তরুণীরা সেখানে এসে দিকনির্দেশনা চাইত। উভাইস তাঁদের এক্সেল, হিসাবরক্ষণ, অফিসের মৌলিক কাজ, সবই শেখাতে লাগলেন। অনেকেই দক্ষতা অর্জন করে সম্মানজনক প্রতিষ্ঠানে চাকরিও পেলেন।
 
কোভিড মহামারীর সময় সংগঠিত উভাইস আলি খানের "ফ্রি কোভিড টেলি কনসালটেশন"
 
“কেউ সাহায্য চাইলে আমি কখনো না বলি না,” তিনি শান্ত গলায় বলেন। “আমি তাঁদের প্রশিক্ষণ দিই, পরামর্শ দিই, এমনকি তারা দিল্লিতে নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে না পারা পর্যন্ত আর্থিক সহায়তাও করি। এই অভিজ্ঞতাই তাঁদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে নিজস্ব ভবিষ্যৎ গড়তে সাহায্য করে।” 
 
যেমন তাঁর কাজ বাড়তে থাকে, তেমনই বাড়ে তাঁর জীবনও। লক্ষ্মী নগরের ছোট সেটআপ থেকে লাজপাত নগরে বাড়ি, আর এখন নিউ ফ্রেন্ডস কলোনিতে বড় অফিস, ব্যক্তিগত উন্নতি ও সামাজিক অবদান, দুই-ই তাঁর জীবনে পাশাপাশি এগিয়েছে। আজ তাঁর অফিস শুধুই কর্মক্ষেত্র নয়; অসংখ্য তরুণের জীবনের উড়ানপথ। “আমি নিজের জীবন বদলাতে কঠোর পরিশ্রম করেছি,” তিনি বলেন। “এখন অন্যদের জীবন বদলাতে আরও বেশি পরিশ্রম করি।”
 
উভাইসের মধ্যে ‘ফিরিয়ে দেওয়ার’ প্রবৃত্তি গভীরভাবে রোপিত। সমাজসেবামূলক পরিবার থেকে উঠে আসা তিনি শিখেছেন, “দানে যে আনন্দ”, সেই মূল্যবোধই তাঁর কাজের কেন্দ্রে রয়েছে। করোনা মহামারির সময়, যখন ভয় আর অভাব দিল্লিকে গ্রাস করেছিল, উভাইস নিজে উদ্যোগ নিয়ে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেন। “সরকার তার কাজ করছিল, কিন্তু আমাদেরও কিছু করা উচিত,” তিনি বলেন। “আমরা কয়েক মাসে ৩০০ কুইন্টাল চাল, আটা, ডাল বিতরণ করেছি, সবাইকে, কোনো প্রশ্ন ছাড়া।”
 
তাঁর মানবিকতা এখানেই থেমে নেই। গত আট বছর ধরে প্রতি মাসের শেষ বৃহস্পতিবার তিনি দরিদ্রদের জন্য বিরিয়ানি রান্না ও বিতরণের আয়োজন করেন। “একবারও বন্ধ হয়নি,” তিনি দৃঢ়ভাবে বলেন। “এটা তাদের মর্যাদা দেওয়ার আমার উপায়।”
 
সামাজিক কর্ম কাজের মধ্যে উভাইস আলি খান 
 
একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট হিসেবে তিনি তাঁর জ্ঞান সমাজের কাজে লাগানোকে দায়িত্ব মনে করেন। ভারত যখন জিএসটি নতুনভাবে চালু করেছিল, ছোট ব্যবসায়ীদের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ে। উভাইস এগিয়ে আসেন, সহজ ভাষায় জিএসটি বোঝাতে একটি বিশেষ সম্মেলন আয়োজন করেন। “একজন সিএ হিসেবে আমার দায়িত্ব ছিল নিজের সম্প্রদায়কে সঠিকভাবে পথ দেখানো,” তিনি বলেন।
 
তাঁর মতে, দান-খয়রাতই সেবার একমাত্র রূপ নয়; প্রকৃত লক্ষ্য হলো ক্ষমতায়ন। “খাবার দেওয়া কিংবা বিয়ের খরচে সাহায্য করা ভালো,” তিনি বলেন, “কিন্তু আমার প্রধান উদ্দেশ্য হলো মানুষকে কর্মক্ষম করা। দক্ষতা ও চাকরি স্থায়ী পরিবর্তন আনে। কর্মসংস্থান শুধু একজনকে নয়, একটি পুরো পরিবারকে উন্নত করে এবং সমাজকে শক্তিশালী করে।”
 
এক বিভ্রান্ত ছাত্র থেকে সমাজ-পরিবর্তনকারী হয়ে ওঠা, উভাইস আলি খানের এই যাত্রা প্রমাণ করে যে প্রকৃত সাফল্য নিজের জন্য কিছু অর্জনে নয়, বরং অন্যকে কী হতে সাহায্য করা যায়, তাতেই নিহিত।