সানিয়া আঞ্জুম/ বেঙ্গালুরু
কর্ণাটকের কোলার জেলার ছোট্ট শহর বেঙ্গারপেট। সেখানেই ১৯৮৭ সালের ২৫ জানুয়ারি এক রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন খুদসিয়া নাজির, স্নেহের নাম খুশি। আজ তিনি ভারতজুড়ে পরিচিত “আয়রন লেডি অফ ইন্ডিয়া” হিসেবে, বিশ্ব রেকর্ডধারী ও আন্তর্জাতিক মাস্টার্স ওয়েটলিফটিং চ্যাম্পিয়ন, নারীর ক্ষমতায়নের এক উজ্জ্বল প্রতীক। পিতৃহীন শৈশব থেকে সিজারিয়ানের পরে ৩০০ কেজি ওজন তোলার মতো বিস্ময়কর অর্জন, খুদসিয়ার পথচলা প্রমাণ করে তাঁর অটুট বিশ্বাসকে: “জীবনের গন্তব্য আমরা নিজেরাই লিখব কঠোর সংকল্প দিয়ে, সমাজের মূল্যবোধও সম্মান রেখে।” তাঁর জীবন সংগ্রাম, ঈমান ও খেলাধুলার প্রতি প্রবল আবেগ সকল নারীর জন্য দুঃসাহস ও শক্তি ফিরে পাওয়ার বার্তা বহন করে।
মাত্র দুই বছর বয়সে খুদসিয়া তাঁর বাবা মোহাম্মদ খাসিমকে হারান, যিনি এক সময় ছিলেন কুস্তিগীর। বাবার মৃত্যু তাঁর জীবনে অসম্ভব শোকের ছায়া ফেললেও সেই শোকই পরবর্তীতে তাঁকে অনুপ্রাণিত করে ক্রীড়াক্ষেত্রে নামতে। মা-ই ছিলেন তাঁর অবলম্বন, এক নিরীহ, পৃথিবীর কঠিন বাস্তবতা সম্পর্কে অজ্ঞ নারী। ছোটবেলা থেকেই অন্য শিশুদের মতো সাধারণ জীবনের ইচ্ছে ছিল না খুদসিয়ার। ভিন্ন কিছু অর্জনের স্বপ্নই তাঁকে তাড়িয়ে বেড়াত। পিতার অনুপস্থিতির বেদনা, রক্ষণশীল মুসলিম সমাজের নারীবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি এবং সংসারে স্বামীর সঙ্গে তৈরি হওয়া নানা সমস্যার মধ্যেও তিনি নিজেকে ভাঙতে দেননি। মাঝে মাঝে মনে হতো, বাবার উপস্থিতি থাকলে হয়তো আইএএস অফিসার বা অলিম্পিয়ান হওয়াই তাঁর ভাগ্যে থাকত।
“আয়রন লেডি অফ ইন্ডিয়া” খুদসিয়া নাজির
কিন্তু শোককে পরাজয় হিসেবে না দেখে তিনি বিশ্বাস করলেন, সংগ্রাম মানুষকে উঁচুতে তুলে দেয়, ধ্বংস করে না। ভোর ৪টায় নামাজ পড়ে দিন শুরু করা খুদসিয়া ঈমানের সঙ্গে মিলিয়েছেন কঠোর পরিশ্রমকে। তাঁর বিশ্বাস, “নিজের জীবনে সাফল্য আনতে হলে নিজের উপরেই ভরসা করতে হবে, কারও উপর নির্ভর করে নয়।” বাবার কুস্তি-জীবনের স্মৃতি তাঁকে নীরবে ধাক্কা দিয়ে গেছে খেলাধুলায় আত্মনিয়োগ করতে, যেন নিজের পথ নিজেই তৈরি করতে পারেন।
তাঁর রক্ষণশীল সমাজে নারীকে বাইরে ব্যায়াম করা বা খেলাধুলা করা “ট্যাবু” বা “হারাম” মনে করা হতো। সন্তান জন্মের পর ওজন কমানোর জন্য যখন তিনি বোরখা পরে স্টেডিয়ামে হাঁটতে শুরু করেন, তখন পুরুষদের উপহাস আর কটূক্তি ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। কিন্তু অপমান তাঁকে থামাতে পারেনি। উপহাসকারীদের বিরুদ্ধে তিনি অভিযোগ দায়ের করেন এসপি দিব্যা গোপীনাথের কাছে। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়, স্টেডিয়ামে তাঁর সঙ্গে দুইজন বোরখা পরা মহিলা এবং নিরাপত্তার জন্য ২০ জন কনস্টেবল মোতায়েন করা হয়। সেই দৃশ্যের পর উপহাসকারীদের চোখ খুলে যায়, “নারী দুর্বল নয়।” খুদসিয়া বলেন, “আমি আমার কষ্টকেই ইন্ধন করেছি উপরে ওঠার জন্য।” সেই মুহূর্ত তাঁর জীবনের মোড় ঘোরানো সময়, যেখানে অপমানই তাঁর শক্তিতে রূপ নেয়।
বাবার কুস্তি-ঐতিহ্য তাঁকে টেনে নিয়ে যায় সবচেয়ে কঠিন খেলাধুলার পথে, ওয়েটলিফটিং। নিজের ভাষায়, “ডিপ্রেশন এবং জীবনের দুর্ভাগ্যের ভারের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য আমি ওয়েটলিফটিং বেছে নিই।” সন্তান জন্মের পর ওজন বেড়ে যাওয়া, গভীর বিষণ্ণতা এবং সমাজের ধারণা যে সিজারিয়ানের পর নারী কিছুই করতে পারে না, এসবকেই চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেন। “মা হওয়ার পর নারীর শক্তি আরও বাড়ে”, খুদসিয়া দৃঢ়ভাবে বলেন। ২০১৩ সালে ২৫ বছর বয়সে তিনি জিমে যোগ দেন ওজন কমানো এবং মনে শান্তি ফিরে পাওয়ার উদ্দেশ্যে। অন্যদের যেখানে ৫ কেজি তুলতেই সমস্যা, তিনি সহজেই ১০ কেজি তুলতে পারতেন। একদিন জিমে হঠাৎ ১১০ কেজি ডেডলিফট করেন, এবং বন্ধুর প্রস্তাবে প্রথম প্রতিযোগিতায় নাম লেখান। “সেদিন থেকেই আমার জীবন পাল্টে যায়।”
খুদসিয়া নাজিরকে সম্মান জানানোর একটি মুহূর্ত
২০২২ সাল থেকে প্রশিক্ষক মোহাম্মদ আমানুল্লাহ বিনামূল্যে তাঁকে প্রশিক্ষণ দেন। তিনি বলেন, খুদসিয়ার কঠোর পরিশ্রম ও লক্ষ্যনিষ্ঠতা তাঁকে গর্বিত করেছে। ২০০৫ সাল থেকে কেএসআরটিসির ফার্স্ট ডিভিশন অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কর্মরত থেকেও তিনি সকাল ৫টা থেকে ৮টা এবং রাতে ৯টা পর্যন্ত অনুশীলন করেছেন। অফিস থেকে সময়সীমায় সুবিধা দেওয়ার জন্য তিনি কৃতজ্ঞ তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রতি।
ওয়েটলিফটিং সম্পর্কে তাঁর স্পষ্ট মত, “অবিবেচকের মতো জীবন ঝুঁকিতে ফেলা ওজন তোলা বোকামি, সেটা ইগো লিফটিং। সঠিক কৌশল না জানলে মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে।” তিনি পুরোপুরি প্রাকৃতিক খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করেন, স্টেরয়েড বা সাপ্লিমেন্টে বিশ্বাস নেই। “শর্টকাট জীবন শেষ করে দিতে পারে”, তিনি সতর্ক করেন। তাঁর মতে, নড়াচড়া ও ব্যায়াম অনেক শারীরিক ব্যথা সারাতে সক্ষম, কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ অজুহাতের মধ্যে নিজেদের বন্দি করে রাখে।
পরিশ্রমের পুরস্কার তিনি পান ৬ ডিসেম্বর ২০২২-এ, সিজারিয়ানের পর প্রথম নারী হিসেবে ৩০০ কেজি (স্কোয়াট ১১০, ডেডলিফট ১২০, বেঞ্চ প্রেস ৭০) উত্তোলন করে বিশ্ব রেকর্ড করেন। এই সাফল্য নারীদের মাতৃত্ব ও সার্জারির পর সীমাবদ্ধতার ধারণা ভেঙে দেয়। এরপর জেলা, রাজ্য ও জাতীয় পর্যায়ে স্বর্ণ জয়ের ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে তিনি এগিয়ে যান, যদিও কোভিডজনিত কারণে ২০২০ সালের জাপান চ্যাম্পিয়নশিপে যেতে পারেননি।
খুদসিয়া নাজিরের 'ন্যাশনাল ওয়েট লিফটিং চ্যাম্পিয়ন' -এর সার্টিফিকেট
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রথম সাফল্য আসে মে ২০২৩-এ দক্ষিণ কোরিয়ার জিওনবুক-এ এশিয়া প্যাসিফিক মাস্টার্স গেমসে, তিনটি স্বর্ণ জয় করে তিনি প্রথম ভারতীয় মুসলিম নারী হিসেবে আন্তর্জাতিক ওয়েটলিফটিং পদক জয় করেন। ২০২৩ সালের নভেম্বরে গ্রীসের অ্যাথেন্সে মাস্টার্স ওয়েটলিফটিং মেডিটেরেনিয়ান–ইন্টারন্যাশনাল ওপেনে রৌপ্য পদক। এর পর ফিনল্যান্ড, জার্মানি ও অস্ট্রেলিয়ার আন্তর্জাতিক চ্যাম্পিয়নশিপে যোগ্যতা অর্জন করেন এবং অস্ট্রেলিয়ায় ৩৫+ বিভাগের স্বর্ণ অর্জন করেন। খুদসিয়ার প্রতিজ্ঞা, “দেশ ও সমাজের নাম উজ্জ্বল করব”, ধীরে ধীরে বাস্তব রূপ নিতে থাকে।
খুদসিয়া সম্মানিত হন কর্ণাটকের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বসবরাজ বোম্মাইয়ের হাত থেকে এবং সংখ্যালঘু উন্নয়ন কর্পোরেশন থেকে ২.৫ লক্ষ টাকা পান, যা তিনি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে যাত্রার জন্য ব্যবহার করেন। মুনোজ জৈন, রউফুদ্দিন কচেরিওয়ালার মতো বিশিষ্টজনের পক্ষ থেকেও সম্মান পান। তিনি পান “পাওয়ার উইমেন” (২০১৯), “স্পোর্টস অ্যাচিভার” (২০২২), এবং “আয়রন লেডি অফ ইন্ডিয়া” (২০২৩) উপাধি।
নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তব্য দেওয়ার আমন্ত্রণ, “বেঙ্গারপেট থেকে বোস্টন”, তাঁর জীবনের আরেক অনন্য অধ্যায়। এমবিএ (এইচআর) এবং সফটওয়্যার অ্যাপ্লিকেশন ডিপ্লোমাধারী খুদসিয়া সমাজসেবী হিসেবেও সক্রিয়। আন্তর্জাতিক ফোরাম ফর অ্যান্টি-করাপশনের মহিলা উইংয়ের জাতীয় সংগঠন সম্পাদক, মাস্টার্স গেমস ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ার ডিজিটাল মার্কেটিং প্রধান এবং কর্ণাটক মাস্টার্স গেমস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে কাজ করছেন।
খুদসিয়া নাজিরকে সম্মান জানানোর একটি মুহূর্ত
খুদসিয়ার বার্তা, “শিক্ষাই জীবনের সমস্যার একমাত্র সমাধান এবং জীবনের উদ্দেশ্য বোঝার পথ। আর্থিক স্বাধীনতার মূলও শিক্ষা, প্রত্যেক নারীর মৌলিক অধিকার।” তাঁর বিশ্বাস, “জীবনে অন্তত একটি খেলাধুলা থাকা প্রয়োজন, বিশেষত নারীর ক্ষেত্রে”, কারণ খেলাধুলা বাধা ভাঙতে শেখায়, নিজের শক্তির পরিচয় করিয়ে দেয়। তাঁর অনুপ্রেরণাদায়ক গল্প বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও ইউটিউব প্ল্যাটফর্মে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ইনস্টাগ্রামে (@khudsiyanazeerofficial) তিনি ব্যায়াম ও অনুপ্রেরণামূলক ভিডিওর মাধ্যমে হাজারো মানুষকে উজ্জীবিত করেন। তিনি প্রমাণ করেছেন, মাতৃত্ব ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়াসাফল্য পাশাপাশি সম্ভব। আইআইএম বেঙ্গালুরু স্টাফ রিক্রিয়েশন ক্লাবসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মঞ্চে তিনি সম্মানিত হয়েছেন। ডালাস, টেক্সাসের ক্রসরোডা স্টুডিওতেও সম্মানের আসনে বসেছেন তিনি। তাঁর আহ্বান, “নেতিবাচকতাকে ভয় পেও না, নিজের পছন্দকে, নিজের স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরো।”
খুদসিয়া নাজিরের জীবন প্রমাণ করে, যে মেয়ে ছোট শহরে পিতৃহীন অবস্থায় বড় হয়েছে, সেখান থেকেই আন্তর্জাতিক ক্রীড়ামঞ্চে সাফল্য অর্জন করা সম্ভব। আবেগের ভারকে শারীরিক শক্তিতে রূপান্তর করে তিনি প্রমাণ করেছেন যে ঈমান, শৃঙ্খলা ও লড়াইয়ের মানসিকতা থাকলে ভাগ্যও বদলে যায়। তাঁর উত্তরাধিকার শুধু ওজন তোলার সাফল্যে নয়, তিনি যেসব নারীর জীবনকে স্বপ্ন দেখার সাহস দেন, তাতেই তাঁর প্রকৃত বিজয়। খুদসিয়ার পথচলা এখনো থামেনি, আরও অনেক উচ্চতা অপেক্ষা করছে তাঁর জন্য। কারণ এই আয়রন লেডির গল্প এখনো শেষ হয়নি, এটি কেবল শুরু।