প্রত্যাহ্বানকে জয় করে, নিজের ভাগ্য নিজেই লিখে, বিপ্লবের সূচনা করা কর্ণাটকের ১০ প্রেরণাদায়ক ব্যক্তিত্ব

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 6 d ago
কর্ণাটকের ১০ প্রেরণাদায়ক ব্যক্তিত্ব
কর্ণাটকের ১০ প্রেরণাদায়ক ব্যক্তিত্ব
 
কর্ণাটক

বেঙ্গালুরুর উচ্চপ্রযুক্তি গবেষণাগার থেকে কুর্গের কফি-বাগান, হাম্পির প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ থেকে মাইসোরের ব্যস্ত রাজপথ, সবখানেই আজ পরিবর্তনের এক অদম্য স্রোত বইছে। এখানেই ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি বিপ্লবের জন্ম, যেখানে শাস্ত্রীয় শিল্পের পাশাপাশি আধুনিক উদ্ভাবনের বিস্তার ঘটেছে; আর প্রতিটি জেলা যেন আলাদা করে বলছে একেকটি পরিবর্তনের গল্প।
 
অনেক কান্নাডিগা শুধু সাম্রাজ্য গড়ে তুলছেন না, বরং অতিক্রম করছেন অসম্ভবকে। কেউ সীমা ভেঙে দিয়েছেন, কেউ অচেনা পথ খুলে দিয়েছেন, কেউ আবার নিজের ভাগ্য নতুন করে লিখেছেন। আজকের এই প্রতিবেদনে কর্ণাটকের এমন দশজন রূপান্তরকারী ব্যক্তিত্বের কথা তুলে ধরা হলো; যাদের সাহস, দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্ম ভবিষ্যতের জন্য নতুন দিশা তৈরি করেছে।
 
রিফাহ তাসকিন
 
১. রিফাহ তাসকিন
 
মাইসোরের বাসিন্দা মাত্র ১৫ বছরের রিফাহ তাসকিন তিন বছর বয়স থেকেই রেসিংয়ের জগতে পা রাখে। প্রাক্তন রেসার বাবা তাজউদ্দিনের তৈরি কাস্টম গাড়িতে করেই তার রেসিং-জীবনের শুরু। পাঁচ বছর বয়সে মাইসোর থেকে বেঙ্গালুরু পর্যন্ত গাড়ি চালিয়ে যায় সে। সাত বছর বয়সে স্কুলের অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে প্রজাতন্ত্র দিবসের প্যারেডেও অংশগ্রহণ করে। নানা বাধা-বিপত্তির মুখোমুখি হয়েও সে গোল্ডেন, এলিট, হাই রেঞ্জ, ইন্ডিয়া, এশিয়া, ওয়ার্ল্ডওয়াইড ও ওয়ান্ডার বুকস, মোট সাতটি বিশ্বরেকর্ড গড়েছে। বাইক, জেসিবি, ক্রেন, বাস, টিপার, রোড রোলার, এমনকি মাত্র আট বছর বয়সে বিমানও চালিয়েছে।
 
রাজ্য-স্তরের বক্সিং পদকজয়ী ও কারাতে যোদ্ধা রিফাহ পাঁচ বছর ধরে মাইসোরের স্বচ্ছতার দূত এবং চার বছর ধরে যক্ষ্মা-যোদ্ধা হিসেবে কাজ করছে। স্ব-অর্থায়নে পড়াশোনা চালানো, থামানো যায় না, এমন মানসিকতা নিয়ে এসএসএলসি-র পরে আইএএস হওয়ার স্বপ্ন দেখছে রিফাহ। সে শুধু রেকর্ড ভাঙেনি, বরং 'অসম্ভব' শব্দটির অর্থই বদলে দিয়েছে।
 
মুসতাক আহমেদ
 
২. মুসতাক আহমেদ
 
বেঙ্গালুরুতে জন্ম নেওয়া দূরদর্শী মুসতাক আহমেদ স্বপ্ন নিয়ে গিয়েছিলেন দুবাই, সঙ্গে ছিল সামনে বিস্তৃত মরুভূমি। তিনি দুবাই পুলিশের ফটোগ্রাফি বিভাগে ৪১ বছর (২০১৮ পর্যন্ত) কাজ করেন। প্রথম ওয়ারেন্ট অফিসার হিসেবে তার ক্যামেরায় ধরা পড়েছে একটি দেশের উত্থানের অসম্ভব সব মুহূর্ত।
 
বুর্জ খলিফার নির্মাণকালীন ছবি, ক্রেন থেকে তোলা কাবার দৃশ্য, শেখ মোহাম্মদের ১৯৭৯ সালের বিবাহ, মদিনার মনোমুগ্ধকর মুহূর্ত, সবই তার ক্যামেরায় অমূল্য সম্পদ হিসেবে সংরক্ষিত। দালানবিহীন দুবাইয়ের আকাশ থেকে তোলা ছবি হোক কিংবা লতা মঙ্গেশকর, মোহাম্মদ রফি, শেখ জায়েদ, এদের পাশে দাঁড়িয়ে তোলা প্রতিকৃতি, ৭৯ বছর বয়সী এই ফটোগ্রাফার ক্ষণিক মুহূর্তকে চিরস্থায়ী করেছেন। তার নীরব বিশ্বাস, “সবচেয়ে ভালো ছবি এখনো তোলা বাকি।”
 
তাজাইউন ওমর
 
৩. তাজাইউন ওমর
 
১৩ বছর বয়সে সংসদ ভবনের ভিড় ঠেলে ইন্দিরা গান্ধীর অটোগ্রাফ নেওয়ার সেই মুহূর্ত থেকেই তাজাইউনের মনে জন্মেছিল, নেতৃত্বের কোনো লিঙ্গ হয় না। বাবার কাপড়ের দোকানে সাহায্য করা কুটচি মেমন সম্প্রদায়ের এই মেয়েটি পরবর্তীতে বেঙ্গালুরুর স্থির কিন্তু গভীর এক বিপ্লবের কারিগর হন।
 
১৯৯৯ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন হিউম্যান টাচ ট্রাস্ট, যা ১০০-র বেশি প্রতিবন্ধী শিশুর সংশোধনী অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা করেছে, আল-আজহার স্কুল গড়েছে, ১,৭৫০-র বেশি গণবিবাহ সম্পন্ন করেছে, দুই হাজারের বেশি মুসলিম মহিলাকে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলেছে এবং বার্ষিক বৃত্তি দিয়ে প্রায় ৩০০ তরুণীর কর্মজীবন সুগঠিত করছে। সুলতান নারী শক্তি পুরস্কার ও কর্ণাটক রাইজিং বিয়ন্ড দ্য সিলিং সম্মানপ্রাপ্ত তাজাইউন প্রমাণ করেছেন, মমতা দিয়ে শতাব্দীপ্রাচীন সমাজ-প্রথাকেও বদলে ফেলা সম্ভব। তার মতে, “আপনি যখন কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন, পরিবর্তন তখনই শুরু হয়।”
 
মোহাম্মদ আলী খালিদ
 
৪. মোহাম্মদ আলী খালিদ
 
বিশ্ব স্কাউটিংয়ের সর্বোচ্চ সম্মান ‘ব্রোঞ্জ উলফ’ পুরস্কারপ্রাপ্ত মোহাম্মদ আলী খালিদ ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী স্কাউট নেতা। চার দশকের কাজের মাধ্যমে তিনি লাখো তরুণ-তরুণীর জীবনে পরিবর্তন এনেছেন।১৯৮০ সালের জাতীয় জ্যাম্বোরির স্বেচ্ছাসেবকতা থেকে ভারতের স্কাউট ও গাইডের অতিরিক্ত প্রধান জাতীয় কমিশনার হওয়া পর্যন্ত, তিনি গড়ে তুলেছেন বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব। ২০১৭-র জাতীয় জ্যাম্বোরি এবং ২০২২-এর আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক জ্যাম্বোরির সফল নেতৃত্ব তার অন্যতম কীর্তি।
 
এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের ‘ভিশন ২০১৩’র স্থপতি, WOSM-এর বৈশ্বিক সংস্কার সহযোগী, SAANSO-র প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তিনি ভারতকে স্কাউটিংয়ের শক্তিশালী কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। ৭০ বছর বয়সেও তিনি বিশ্বজুড়ে ২০% সদস্য বৃদ্ধির ও ৫০% যুব নেতৃত্বের লক্ষ্যে কাজ করছেন।
 
রহমত তারিকেরে
 
৫. রহমত তারিকেরে
 
১৯৫৯ সালে জন্ম নেওয়া রহমত তারিকেরের শৈশব কেটেছে এমন এক সমাজে, যেখানে হিন্দু-মুসলমান একসঙ্গে বাস করতেন, গল্প ভাগ করে নিতেন। ১৯৯২ সালের বাবরি মসজিদ ধ্বংস তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। তিনি ছেড়ে দেন কঠোর সাহিত্য সমালোচনা, নেমে পড়েন কর্ণাটকের বহুস্তরীয় সংস্কৃতি, সুফি সাধক, নাটপন্থী, শক্ত কবি ও লোক-ঐতিহ্যের চর্চায়।
 
তার ৩০টি প্রভাবশালী গ্রন্থের মধ্যে চারটি কর্ণাটক সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত এবং ‘কট্টিয়ানচিনা দারি’ ২০১০ সালে কেন্দ্রীয় সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার লাভ করে। ২০১৫ সালে অসহিষ্ণুতা ও এম এম কালবুর্গীর হত্যার প্রতিবাদে তিনি রাষ্ট্রীয় পুরস্কার ফিরিয়ে দেন। নম্র এই অধ্যাপক বলতেই ভালোবাসেন, “আমি পরিবর্তনকারী নই।” কিন্তু কর্ণাটকের আত্মায় যে বহুত্বের স্রোত বয়ে চলেছে, তার গভীর প্রভাব সে পথেই।
 
খুদসিয়া নাজির
 
৬. খুদসিয়া নাজির
 
১৯৮৭ সালে বাঙ্গারপেটে জন্ম, দুই বছর বয়সেই বীরপিতা মারা যান। রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারে উপহাস ও বাধা কাটিয়ে খুদসিয়া নিজের যন্ত্রণা শক্তিতে রূপান্তর করেন। সিজারিয়ান অপারেশনের মাত্র ৪০ দিনের মাথায় ৩০০ কেজি ডেডলিফট করে ২০২২ সালে বিশ্বরেকর্ড গড়েন। তারপর এশিয়া-প্যাসিফিক মাস্টার্স ২০২৩–এ তিনটি সোনা, এথেন্সে রুপো, কমনওয়েলথ (অস্ট্রেলিয়া) ও জার্মানিতে সোনা জিতে আন্তর্জাতিক মঞ্চে ইতিহাস গড়েন।
 
অন্তর্জাতিক ভারোত্তোলনে পদকজয়ী প্রথম ভারতীয় মুসলিম নারী তিনিই। বোরখা পরে পুলিশ পাহারায় হাঁটা থেকে হার্ভার্ডের মঞ্চ পর্যন্ত পৌঁছে খুদসিয়া প্রমাণ করেছেন, মাতৃত্বই নারীর শক্তিকে হাজার গুণ বাড়ায়। তার জীবনমন্ত্র; শিক্ষা, খেলাধুলা, এবং নিজের ভাগ্য নিজে লেখা।
 
ফৌজিয়া তারান্নুম
 
৭. ফৌজিয়া তারান্নুম
 
২০১৫ ব্যাচের আইএএস কর্মকর্তা (AIR 31) ফৌজিয়া তারান্নুম কোনও কোচিং না নিয়েই বেঙ্গালুরুর পাবলিক লাইব্রেরি থেকে পড়ে প্রথম চেষ্টায় UPSC উত্তীর্ণ হন। আইআরএস-এ স্বর্ণপদক লাভের পর কালাবুরাগিকে জাতীয় মিলেট হাবে পরিণত করেন ‘কালাবুরাগী রুটি’ প্রকল্পের মাধ্যমে। হাজারো মহিলা স্বনির্ভর গোষ্ঠীকে ক্ষমতায়ন, জেলা প্রশাসনকে শীর্ষমানের SSLP জেলা হিসেবে গড়ে তোলা এবং গ্রাম পঞ্চায়তের গ্রন্থাগার পুনরুজ্জীবিত করায় তার অবদান অনন্য।
 
২০২৫ সালে দেশের সবচেয়ে স্বচ্ছ ভোটার তালিকা তৈরি করার জন্য তিনি রাষ্ট্রপতির পুরস্কারও পান। ৩৬ বছর বয়সী এই শান্ত, নম্র জেলা প্রশাসক ইসলামোফোবিক অপমানের মুখেও উত্তরে শুধু কাজকেই বেছে নিয়েছেন। তিনি চিৎকার করে পরিবর্তন আনেন না, পরিবর্তন তিনি নির্মাণ করেন।
 
জাফর মহিউদ্দিন
 
৮. জাফর মহিউদ্দিন
 
রায়চুরের রেডিওতে ‘মার খাওয়া’ সেই ছেলেটি, জাফর মহিউদ্দিন। স্কুলে অন্যদের প্রেমপত্র লিখে দিতেন চুপিচুপি। বাসযাত্রায় নাট্যকার আর নাগেশের দেওয়া প্রশংসা তার জীবন বদলে দেয়। তিনি UPSC ও বিমানবাহিনীর চাকরি দুটোই ছেড়ে দেন। ১৯৮৮ সালে গড়ে তোলেন কাঠপুতলিয়াঁ থিয়েটার গ্রুপ, পুতুলনাট্যকে তিনি সমাজের কুসংস্কারের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন।
 
গিরীশ কার্নাডের ‘টিপু সুলতান কে খোয়াব’ অনুবাদ থেকে শুরু করে ‘জবান মিলে হায় মাগর’ নাটকের মাধ্যমে উর্দুকে ঘিরে ছড়ানো ভুল ধারণা দূর করেছেন। ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে কর্ণাটক সরকার তাকে রাজ্যোৎসব পুরস্কারে ভূষিত করে।
 
 মৌলানা ড. মোহাম্মদ মাকসুদ ইমরান রাশাদি
 
৯. মৌলানা ড. মোহাম্মদ মাকসুদ ইমরান রাশাদি
 
বেঙ্গালুরুর জামিয়া মসজিদের প্রধান ইমাম ও অধ্যক্ষ ড. মাকসুদ ইমরান ১৮ মাসে কোরআন মুখস্থ করেন, পরে উর্দু সাহিত্যে পিএইচডি অর্জন করেন। সংগ্রামী একটি মাদ্রাসাকে বদলে ৪০০ দরিদ্র ছাত্রছাত্রীর জন্য শতভাগ সক্ষম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করেছেন।
 
উত্তেজনা ছড়ানোর বিভিন্ন ঘটনাকে তিনি শান্তির ভাষায় রূপ দিয়েছেন। ২০২৫ সালের “আই লাভ মুহাম্মদ” ব্যানার বিতর্কও তিনি সংঘর্ষের আগেই থামিয়ে দিতে সক্ষম হন। তেহরানে বক্তব্য রাখা, সৌদি রাজপরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ, সব মিলিয়ে তার কাজ প্রমাণ করে, ঐক্য গড়ে ওঠে ব্যানারে নয়, কাজে।
 
সৈয়দ নওয়াজ মিফতাহি
 
১০. সৈয়দ নওয়াজ মিফতাহি
 
সম্পূর্ণ দৃষ্টি থাকা সত্ত্বেও ২০১১ সালে মুম্বাইতে এক অন্ধ শিশুর কোরআন তেলাওয়াত সৈয়দ নওয়াজ মিফতাহির জীবন বদলে দেয়। সেদিনই তিনি সিদ্ধান্ত নেন, এইসব দৃষ্টিহীন শিশুদের ‘চোখ’ হবেন। তিনি সম্পূর্ণ ব্রেইল শিখে নেন। হায়দ্রাবাদ থেকে কাশ্মীর,সব জায়গায় তিনি এমন শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেন, যারা একসময় তারই ছাত্র ছিলেন।
 
২০২৫ সালের নভেম্বরে তিনি উমাং ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরিচালনা করেন সাতজন দৃষ্টিহীন ট্রাস্টি ও একজন দৃষ্টিসম্পন্ন সাহসী তরুণী। এখানে ধর্ম বা জাত নির্বিশেষে প্রতিটি দৃষ্টিহীন ব্যক্তি কোরআন, কম্পিউটার ও আত্মনির্ভরতার শিক্ষা নিতে পারে।