বালিয়াড়ি থেকে আকাশরেখা: দুবাইয়ের মহাকাব্যিক উত্থানকে ফ্রেমবন্দি করা আলোকচিত্রী মুসতাক আহমদের গল্প

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 4 d ago
মুসতাক আহমদ
মুসতাক আহমদ
 
সানিয়া আঞ্জুম / বেঙ্গালুরু 
 
একসময় বিস্তীর্ণ আরব মরুভূমির নীরবতার মাঝে, যখন দুবাই কেবল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছে, তখন এক তরুণ আলোকচিত্রী তাঁর ক্যামেরা বুকে নিয়ে বালির দোলায় দাঁড়িয়ে সেই স্বপ্নের আলো প্রথমবারের মতো দেখতে পান। সেই তরুণটির নাম মুসতাক আহমদ , যিনি পরে হেলিকপ্টারের জানালায় ভেসে ওঠা বুর্জ খলিফার প্রথম উদীয়মান কঙ্কালকে ক্যামেরায় ধরে ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিয়েছিলেন। বালির তীর থেকে আকাশরেখায় রূপান্তরের যে মহাকাব্যিক যাত্রা, তার সবচেয়ে নিখুঁত সাক্ষী হয়ে আছেন এই মানুষটি, স্বপ্নকে ফ্রেমে বন্দি করা এক নীরব ইতিহাসরক্ষক।
 
ভারতের বেঙ্গালুরুতে জন্ম নেওয়া মুসতাক জীবনের প্রথম অধ্যায়েই দুবাইয়ের টানে আকৃষ্ট হন। তখনকার UAE ছিল নবগঠিত, পুরনো অভ্যাস ঝেড়ে নতুন দিগন্তের দিকে ছুটতে থাকা এক দেশ। ২০২২ সালে তাঁর বয়স ছিল ৭৬, এখন ২০২৫ সালে তিনি ৭৯। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে দুবাই পুলিশের ফটোগ্রাফি বিভাগের প্রধান হিসেবে কাজ করেছেন, ২০১৮ সালে অবসর নেওয়ার আগে পর্যন্ত। তাঁর ক্যামেরা শুধু ছবি তোলে না, তাঁর লেন্সে ধরা পড়েছে একটি জাতির উত্থান, হাজারো মানুষের জীবনের পরিবর্তন এবং মরুভূমি থেকে মহানগর হয়ে ওঠার কাহিনির প্রতিটি স্তর।
 

ছোটবেলা থেকেই ফটোগ্রাফির প্রতি টান থাকলেও মুসতাক তাঁর প্রকৃত ক্যানভাস খুঁজে পান দুবাইয়ে। দুবাই পুলিশে যোগ দিয়ে ক্রমে বিভাগের প্রধান হয়ে ওঠেন, এবং উন্নত প্রযুক্তি শিখতে অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত ঘুরে আসেন। তিনি স্মরণ করেন ধাহী খলফান তামিম ও আবদুল্লাহ খলিফা আল মারির মতো নেতাদের সঙ্গে কাজ করার সময়, যাঁদের দূরদৃষ্টি UAE-এর প্রযুক্তিগত অগ্রগতিকে অনেক দূর এগিয়ে দিয়েছিল। তাঁর তোলা প্রতিটি ছবি শহরের অগ্রগতির স্পন্দন ধরে রাখে, সাধারণ কর্তব্যগুলোকে পরিণত করে মূল্যবান ঐতিহাসিক দলিলে।
 
ফটোগ্রাফির যাত্রায় মুসতাক-এর সবচেয়ে আবেগময় অভিজ্ঞতা ছিল মক্কার কাবা ও মদিনার পবিত্র সৌন্দর্য ক্যামেরায় তুলে ধরা। ক্রেন ব্যবহার করে তোলা সেই বিরল ছবিগুলো আজও লক্ষ লক্ষ মুসলিমের ঘরে টানানো আছে। তাঁর ভাষ্যে, কাবার প্রথম ছবি ধারণের অনুভূতি ছিল অভিভূত করা এক মেলবন্ধন, যেখানে ছিল শ্রদ্ধা, বিস্ময় ও গভীরতা। ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সেই সম্মান তাঁকে মানুষের কাছে “সৌভাগ্যবান আলোকচিত্রী” হিসেবে পরিচিত করেছে।
 
মুসতাক আহমদের জীবনের পাতায় জায়গা পেয়েছেন আমিরাতের কিংবদন্তি শাসকরাও। শেখ জায়েদ বিন সুলতান আল নাহয়ানের মানবিকতা তাঁকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল। একইভাবে শেখ রাশিদ এবং শেখ মাকতুমের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ ছিল একেকটি অভিজ্ঞতা, যা দেখিয়েছে ক্ষমতার কেন্দ্রে থেকেও কেমন হতে পারে বিনয়, স্বচ্ছতা ও মানবিকতা। এইসব মুহূর্ত শুধু তাঁর ক্যামেরায় নয়, তাঁর নিজের মনেও অম্লান হয়ে আছে।
 
দুবাইয়ের কিছু দিগ্‌গজদের সঙ্গে মুসতাক আহমদের অবিস্মরণীয় মুহূর্ত
 
তাঁর ক্যারিয়ারের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায় হলো ১৯৭৯ সালের শেখ মোহাম্মদ বিন রাশিদ আল মাকতুমের বিয়ে। আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের ভিড় পেরিয়ে মুসতাক যখন শেখ মোহাম্মদকে গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াতে অনুরোধ করলেন, তিনি হাসিমুখে তাতে সাড়া দিয়েছিলেন। অনুষ্ঠানে শেখ জায়েদ, শেখ রাশিদ ও শেখ মোহাম্মদ, তিন নেতাকে একত্রে আনন্দে মেতে উঠতে দেখা ছিল এক অমূল্য দৃশ্য, যা তাঁর স্মৃতিতে রয়েই গেছে।
 
হেলিকপ্টারের ওপরে বসে মুসতাক যে দুবাইকে দেখেছেন, তা সময়ের স্রোতে বদলে গেছে বারবার। ১৯৭০-এর দশকের ঘড়িঘর, যখন মাকতুম ব্রিজই ছিল না, ১৯৮০-এর দশকের ট্রেড সেন্টার, যখন শেখ জায়েদ রোডের কোনো অস্তিত্ব ছিল না, আর ২০১৪ সালে তাঁর তোলা বুর্জ খলিফার উপরের দৃষ্টিকোণ, সবই দুবাইয়ের রূপান্তরের অমূল্য দলিল। এক্সপো বিড জয়ের মুহূর্তেও তিনি ছিলেন শেখ মোহাম্মদের পাশে, ইতিহাসের মাঝখানটায় দাঁড়িয়ে।
 
দুবাই পুলিশের সঙ্গে ৪১ বছরের কাজ তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় গর্ব। এক চমকপ্রদ অনুষ্ঠানে দুবাই পুলিশ যখন তাঁকে সম্মান জানায়, কর্নেল ড. আহমেদ মোহাম্মদ আল সাদি তাঁকে জড়িয়ে ধরে কপালে চুম্বন করেন, অবসরপ্রাপ্ত কারও জন্য এমন সম্মান বিরলই বলা যায়। বিভিন্ন বিভাগ তাঁকে বিদায় জানায় অসীম ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা দিয়ে।
 
দুবাইয়ের একজন দিগ্‌গজদের সঙ্গে মুসতাক আহমদের অবিস্মরণীয় মুহূর্ত
 
এই পুরো যাত্রায় মুসতাক-এর পরিবার ছিল তাঁর নীরব শক্তি। তাঁর সুন্দর, সহৃদয়া স্ত্রী এবং সাত সন্তান তাঁর ব্যস্ত জীবন, দীর্ঘ ভ্রমণ এবং রাত জাগা সম্পাদনাগুলো সযত্নে সহ্য করেছেন। আত্মীয়দের চোখে তাঁরা ছিলেন “ড্রিম কাপল”, এমন বোঝাপড়া ও ভালোবাসার বন্ধন লেখকও নিজের চোখে বহুবার প্রত্যক্ষ করেছেন।মুসতাক-এর তোলা ছবি UAE-জুড়ে প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে, অনেক ছবি পরিণত হয়েছে চিত্রকলায়। তিন শাসকের সঙ্গে তাঁর একটি কোলাজ, দুবাইয়ের ইতিহাসে তাঁর অবস্থানকে আরও দৃঢ় করে।
 
জাপান সফরে তিনি দেখেছিলেন, মানুষের আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে ক্ষুদ্র, নিঃস্বার্থ আচরণে। কোনো স্টেশন কর্মী যখন হুইলচেয়ারের জন্য র‍্যাম্প বহন করে দৌড়ে আসেন, বা কিয়োটোর রিকশাওয়ালা অতিরিক্ত অর্থ নিতে অস্বীকার করেন, সেইসব অদেখা দয়া তাঁর মনে চিরদিনের মতো থেকে গেছে। 
 
মুসতাক বিশ্বাস করেন, একটি ছবি সফল তখনই, যখন তা আবেগ ধরে রাখতে পারে চিরকাল। তাঁর মতে, ধৈর্য, পর্যবেক্ষণ ও আত্মার গভীরতা, এই তিন গুণ আলোকচিত্রকে মহৎ করে তোলে। আর তাঁর সোনালি নীতি, ছবি তোলার আগে সেটিকে প্রথমে মনে আঁকতে হয়। কল্পনাই শিল্পের প্রকৃত আলো। যদি আর একবার কোনো স্মৃতি ক্যামেরায় ধারণ করার সুযোগ মিলত, তিনি আবারও তুলতেন শেখ মোহাম্মদের বিয়ের ছবি, কারণ সেই আনন্দ, ঐক্য আর উচ্ছ্বাসই ছিল UAE-র প্রকৃত আত্মা।
 
দুবাইয়ের কিছু দিগ্‌গজদের সঙ্গে মুসতাক আহমদের অবিস্মরণীয় মুহূর্ত
 
ফটোগ্রাফির যাত্রায় মুসতাক-এর সাক্ষাৎ হয়েছে সঙ্গীত ও চলচ্চিত্রের কিংবদন্তিদের সঙ্গে, গুলজার, মোহাম্মদ রফি, লতা মঙ্গেশকর, তালত মাহমুদ, দিলীপ কুমার থেকে শুরু করে রাহাত ফতেহ আলি খান পর্যন্ত। শিল্প, বিনয় ও সংস্কৃতির সেইসব মুহূর্ত আজও তাঁর স্মৃতিতে জীবন্ত। তিনি ঘনিষ্ঠ হয়েছেন ভারতের সেনাদিগ্‌গজদের সঙ্গেও, জেনারেল রায়না থেকে শুরু করে ফিল্ড মার্শাল কে. এম. করিয়াপ্পা পর্যন্ত। করিয়াপ্পার সঙ্গে সাক্ষাৎ তিনি তুলনা করেন “ইতিহাসকে ছুঁয়ে দেখার অভিজ্ঞতা”-র সঙ্গে।
 
জীবনের শ্রেষ্ঠ ছবি কোনটি, জিজ্ঞেস করলে মুসতাক বিনয়ের সঙ্গে বলেন, “এখনও তোলা হয়নি।” এটাই প্রকৃত শিল্পীর স্বভাব, পরবর্তী শ্রেষ্ঠতাকে খুঁজে চলা এক অন্তহীন যাত্রা। আজও মুসতাক স্মরণ করিয়ে দেন, একজন আলোকচিত্রী শুধু ছবি তোলে না, ইতিহাস রচনা করে। যখন অনেকেই বালু দেখেন, তিনি সেখানে দেখেছেন ভবিষ্যৎ, আর শাটার টিপে বলেছেন, “দেখে যাও, স্বপ্ন সত্যি হচ্ছে।”