একসময় সহর ক্লিনিকাল ডিপ্রেশন এবং বর্ডারলাইন পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডারে ভুগছিলেন। চিকিৎসার সময় তিনি একাকিত্ব, অসহায়তা এবং বিচ্ছিন্নতার গভীর অনুভূতির মধ্য দিয়ে গিয়েছিলেন। সেই কঠিন সময়ই তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছিল মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে কাজ করতে।
তিনি বলেন, “আমি দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নিয়েছি যে আর কেউ যেন এমন একাকিত্বের মধ্য দিয়ে না যায়। এই উপলব্ধি তখনই আসে, যখন ভাবলাম, যদি কেউ আমার মানসিক সমস্যাগুলো নিয়ে খোলাখুলি কথা বলত, হয়তো আমি অনেক দ্রুত সেরে উঠতে পারতাম।”
২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে সহর শুরু করেন তাঁর অভিযান, “ব্রেকিং স্টিগমা: ওয়ান মাইল অ্যাট এ টাইম”। দিল্লি থেকে কাশ্মীর পর্যন্ত ২,৭৭৯ কিলোমিটারের এক বাইক যাত্রা। এটি শুধু ভৌগোলিক সফর ছিল না, বরং সমাজের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নীরবতা ও কলঙ্কের বিরুদ্ধে এক আবেগময় যাত্রা ছিল।
২০ এপ্রিল, সহর দিল্লি থেকে তাঁর রয়্যাল এনফিল্ড বাইকে রওনা দেন সমাজকর্মী দেব দেশাইকে সঙ্গে নিয়ে। পরে তাঁর সঙ্গে যোগ দেন মহারাষ্ট্রের গায়িকা ও সমাজকর্মী নাজনীন শেখ, মধ্যপ্রদেশের চলচ্চিত্র নির্মাতা সমন্যু শুক্লা, এবং কাশ্মীরের মেডিক্যাল গ্র্যাজুয়েট মেহরাজুদ্দিন ভাট।
সহর হাশমি ও তাঁর দল
সমন্যু ও মেহরাজ তাঁদের ক্যামেরায় এই যাত্রার নথি তৈরি করেন। তাঁদের প্রণীত ডকুমেন্টারি সহরের গল্প এবং তাঁর বার্তা অসংখ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়। ২০ দিনের যাত্রায় সহর ২১টি শহরে ৩০টিরও বেশি ইন্টারঅ্যাকটিভ কর্মশালা পরিচালনা করেন, আনন্দনাগ, বারামুলা, চণ্ডীগড়, দিল্লি, জলন্ধর, জম্মু, কাংগ্রা, কুপওয়ারা, লুধিয়ানা, মুকেরিয়ান, রোহতক, শ্রীনগর, সোপোরে এবং পাট্টান সহ বিভিন্ন জায়গায়।
তিনি প্রায় ৩,৫০০ জন তরুণ, ছাত্রছাত্রী, গ্রামবাসী এবং মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলেন। সহর শুধু নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেননি, অংশগ্রহণকারীদেরও উৎসাহিত করেছেন খোলাখুলি কথা বলতে।ওই কর্মশালাগুলো এমনভাবে সাজানো ছিল যেখানে সহর প্রথমে নিজের গল্প বলেন, তারপর অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে উৎসাহ পান। এর ফলে মানুষ বুঝতে শেখে যে মানসিক অসুস্থতা লজ্জার কিছু নয়, আর সাহায্য চাওয়া দুর্বলতার লক্ষণ নয়।
যাত্রা অবশ্য সহজ ছিল না। ২০ এপ্রিল রামবান জেলায় ভূমিধসের কারণে হাইওয়ে বন্ধ হয়ে যায়। ২২ এপ্রিল পাহালগামে সন্ত্রাসী হামলা হয় এবং ২ মে আবারও ভূমিধসের কারণে রাস্তায় বাধা আসে। তবুও এসব বাধা সহর ও তাঁর দলকে নিরুৎসাহ করেনি। তাঁরা রাজৌরি, শোপিয়ান ও পীর পাঞ্জাল পাস হয়ে যাত্রা সম্পন্ন করেন।
সহর হাশমি তাঁর সার্টিফিকেট গ্রহণ করার একটি মুহূর্ত
এই অভিযানের প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় বিপুল সাড়া পড়ে। হাজারো মানুষ সহরের উদ্যোগের প্রশংসা করেন এবং এটিকে এক আন্দোলন বলে আখ্যা দেন। একজন ব্যবহারকারী লিখেছেন, “নিজের কষ্টের কথা এত প্রকাশ্যে বলা এক অসাধারণ সাহসিকতার কাজ।” অন্য এক ব্যবহারকারী মন্তব্য করেন, “যাত্রার আগে এবং পরে সহরের মধ্যে স্পষ্ট পরিবর্তন দেখা যায়, তিনি যেন নতুন আলো ছড়িয়েছেন।”
সহরের এই অভিযানের জন্য ইন্টারন্যাশনাল বুক অফ রেকর্ডস তাঁকে “মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সর্বাধিক সেমিনার আয়োজনকারী” হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। সিএসআইআর-এনআইএসসিপিআরের অবসরপ্রাপ্ত বিজ্ঞানী অধ্যাপক সুরজিৎ দাবাসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কর্মশালাগুলিতে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে প্রায় ৪২.৩০ শতাংশ এমন মানুষ ছিলেন, যাদের কাছের কেউ না কেউ মানসিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন।
সহর ও দেবের এই সামাজিক উদ্যোগের শুরু হয়েছিল কোভিড-১৯ মহামারির সময় থেকে। তখন তাঁরা ৯০ জন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, কাউন্সেলর ও থেরাপিস্টের একটি দল গঠন করেন যারা বিনামূল্যে অনলাইন কাউন্সেলিং দিতেন। আজ সেই নেটওয়ার্কে ১৪০ জন বিশেষজ্ঞ রয়েছেন এবং তাঁরা ইতিমধ্যে ৩০০-র বেশি মানুষকে সহায়তা করেছেন।
সহর হাশমি ও তাঁর দল ভ্রমণ করা শহরের নাম
আজ সহর শুধু ফ্যাশন স্টাইলিস্ট বা মোটিভেশনাল স্পিকার নন, তিনি মানসিক স্বাস্থ্যের এক অগ্রদূত। তাঁর ইচ্ছা, স্কুল ও কলেজে মানসিক স্বাস্থ্যের উপর কোর্স অন্তর্ভুক্ত করা হোক, এবং যুবসমাজকে “মেন্টাল হেলথ ফার্স্ট এইড” হিসেবে প্রশিক্ষিত করা হোক। সহরের বিশ্বাস, যদি আমরা মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে চুপ থাকি, তবে এই নীরবতা ধীরে ধীরে সমাজকে ভেতর থেকে ক্ষয় করবে।
সহরের যাত্রা এক গভীর বার্তা বহন করে, যদি ইচ্ছা দৃঢ় হয়, তবে ব্যক্তিগত কষ্টও সমাজ পরিবর্তনের শক্তিতে রূপ নিতে পারে। “কলঙ্ক তোড়া: এক মাইল এক বার” শুধু একটি অভিযান নয়, এটি ছিল বহুদিন ধরে চাপা পড়ে থাকা লক্ষ লক্ষ কণ্ঠের প্রতীক। সহর, দেব ও তাঁদের দল প্রমাণ করেছেন, ভারতের শহর ও গ্রামে মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে পরিবর্তনের ঢেউ আনা সম্ভব, যদি কেউ শুধু এই কথা বলে ওঠে, “তুমি একা নও।”