বিদুষী গৌর / নয়াদিল্লি
ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধনে ভরপুর দিল্লির কেন্দ্রস্থলে ড. আমনা মির্জা একজন শিক্ষিকা হিসেবে মানুষের মানসিকতায় গভীর পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছেন। পেশায় তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞান প্রভাষক, তাই স্বভাবতই তাঁর প্রবৃত্তি পরিবর্তনমুখী।
ড. মির্জার এই পথচলা শিক্ষা-সম্পৃক্ত নানা কঠিনতাকে চ্যালেঞ্জ করে। তিনি শিক্ষক, সমাজকর্মী, সাংস্কৃতিক পৃষ্ঠপোষক, এমন বহু ভূমিকায় নিজেকে যুক্ত রেখেছেন। পাশাপাশি, সবচেয়ে বড় কথা, তিনি একজন গর্বিত দিল্লিবাসী, যিনি বিশ্বাস করেন যে বৈচিত্র্যের মধ্য দিয়েই একটি জাতির আত্মা গড়ে ওঠে।
একটি অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দেওয়ার মুহূর্তে আমনা মির্জা
ড. আমনা মির্জা শুধু একজন শিক্ষাবিদ নন, তিনি একজন পরামর্শদানকারীও। তিনি শিক্ষাকে পরিবর্তনের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে গণ্য করেন। তাঁর বক্তৃতায় প্রায়ই পাঠ্যপুস্তকের বাইরে উঠে আসে উর্দু কবিতা, ভারতীয় ইতিহাস এবং সমকালীন ঘটনাবলীর প্রসঙ্গ। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করা ড. মির্জা তাঁর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে শুধু একাডেমিক উৎকর্ষের জন্য নয়, বরং ভারতের গণতান্ত্রিক আলোচনাকে এক অনন্য দিশা দেখানোর ভূমিকার জন্যও শ্রদ্ধা করেন।
তাঁর শ্রেণিকক্ষ তাঁর আদর্শের মতোই অন্তর্ভুক্তিমূলক। “শিক্ষার অর্থ শুধু ডিগ্রি নয়। এটি সম্মানের বিষয়”, তিনি বলেন। বঞ্চিত ও নিম্ন-প্রতিনিধিত্বমূলক পটভূমি থেকে আসা শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ তিনি গভীরভাবে অনুভব করেন। প্রথম প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের পথপ্রদর্শন করতে পারা তাঁর কাছে বিশেষ গৌরবের।
পরিশ্রমের মূল্য সম্পর্কে তিনি অটল। তিনি প্রায়ই তাঁর ছাত্রছাত্রীদের স্মরণ করিয়ে দেন, সফলতার দুটি উপায় আছে: কঠোর পরিশ্রম এবং প্রশংসা করা। তাঁর কাছে কঠোর পরিশ্রমের কোনও বিকল্প নেই। সেই বিশ্বাসকে সামনে রেখেই তিনি বহু বছর ধরে একাডেমিক শৃঙ্খলার সঙ্গে সমাজের বিভিন্ন কাজে যুক্ত থেকেছেন।
একটি অনুষ্ঠানে আমনা মির্জা
ড. মির্জা প্রায়ই গালিব বা কবীরকে সম্মানের সঙ্গে স্মরণ করেন। সাহিত্যিক ঐতিহ্য ও ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধে গড়ে ওঠা এক পরিবারে তাঁর বেড়ে ওঠা। তাঁর বিশ্বাস, ভাষা ও সংস্কৃতি হলো সম্প্রীতি বজায় রাখার সবচেয়ে শক্তিশালী উপায়। তাঁর একাডেমিক কাজ তাঁর সাংস্কৃতিক সক্রিয়তার সঙ্গে যুক্ত; তিনি গঙ্গা-যমুনি তেহজিব নিয়ে বিস্তর লেখালেখি করেছেন, উত্তর ভারতের হিন্দু ও মুসলিমদের মিলিত শতাব্দীপ্রাচীন সহাবস্থানের সংস্কৃতি, বিশেষত দিল্লি ও লখনউতে।
তিনি বলেন, “দিল্লিতে হিন্দু মন্দিরের পাশেই সুফি দরগাহ রয়েছে। এটি শুধু ভৌগোলিক পরিচয় নয়, এটি আমাদের ইতিহাস।” পুরান দিল্লিতে ‘মুশায়ারা’-র আয়োজন, আন্তধর্মীয় সংলাপ বা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ভ্রমণ, ড. মির্জা ক্রমবিভাজিত পৃথিবীতে এই মিশ্র সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
একাডেমিক জগতের বাইরেও তাঁর বক্তৃতা বহু মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক ঝড়ঝাপটার মধ্যেও পথ দেখিয়েছে। অনিশ্চয়তার মধ্যেও অধ্যবসায়ে বিশ্বাসী তিনি। তিনি প্রায়ই বলেন, “কোনো ঝড় স্থায়ী নয়। এগিয়ে চলুন, সর্বদা পরিবর্তনের সন্ধান করুন।” এই অন্তর্গত স্থিতিস্থাপকতাই তাঁর পাণ্ডিত্য ও সামাজিক কর্মযজ্ঞকে সংজ্ঞায়িত করে।
আমনা মির্জা
কোভিড-১৯ লকডাউনের সময়, যখন বিশ্বের অধিকাংশই স্থবির, তখন তিনি খাদ্য বিতরণ, চিকিৎসা সহায়তা এবং অনলাইন শিক্ষাসমর্থনের জন্য স্বেচ্ছাসেবী দল সংগঠিত করেন। তাঁর ‘সবাইয়ের জন্য বই’, একটি তৃণমূল প্রকল্প, যা অভাবী মহল্লাগুলিতে ছোট ছোট গ্রন্থাগার সৃষ্টি করেছে। তাঁর এই উদ্যোগ দিল্লির নানা সম্প্রদায়ের মধ্যে নীরব এক বিপ্লব ঘটিয়েছে।
ড. মির্জা লিঙ্গ, সংখ্যালঘু অধিকার ও শিক্ষা সংস্কার নিয়ে আলোচনায় নিয়মিত অংশ নেন। তাঁর চিন্তাশীল ও দৃঢ় মনোভাব এসব আলোচনাকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে। তাঁর সক্রিয়তা প্রচারের জন্য নয়; বরং তিনি বিশ্বাস করেন বুদ্ধিজীবীদের সমাজে নৈতিক দিশানির্দেশকের ভূমিকা থাকা উচিত।
সোহন লাল দ্বিবেদীর প্রিয় পংক্তিগুলি তিনি প্রায়ই আওড়ান, “লেহরোঁ সে ডরকর নৌকা পার নেহি হোতি, কোশিশ করনে ওয়ালো কি কভি হার নেহি হোতি।” এই পংক্তিগুলি তাঁর জীবনে গভীরভাবে প্রতিফলিত, যেখানে চ্যালেঞ্জ ভয়ের বিষয় নয়, বরং আরও প্রচেষ্টা ও আরও সহমর্মিতার আহ্বান।
ওনাম উৎসব উদযাপন করার মুহূর্তে আমনা মির্জা
অনেক জায়গায় ভ্রমণ করলেও দিল্লির প্রতি তাঁর টান গভীর। তিনি শহরটিকে “ভারতীয় সংস্কৃতির জীবন্ত গ্রন্থাগার” বলে অভিহিত করেন। দিল্লির প্রতি তাঁর ভালবাসা শুধু একাডেমিক লেখায় নয়, দৈনন্দিন জীবনে প্রতিফলিত, লোধি গার্ডেনে হাঁটাহাঁটি, দিল্লি হাটে স্থানীয় শিল্পীদের সমর্থন, অথবা পাশের চত্বরে সাক্ষরতা অভিযানে অংশগ্রহণ।
তিনি বলেন, “ভবিষ্যতের দিকে এগোতে গিয়ে দিল্লি আমাকে ইতিহাসের কথা শুনতে শিখিয়েছে।” সত্যিই, এমন সময়ে যখন রাজধানী শহরগুলোতে পরিচয় ও মতাদর্শের সংঘর্ষ বাড়ছে, তাঁর কণ্ঠস্বর স্পষ্টতা, সহানুভূতি ও আশার বার্তা দেয়।
ড. আমনা মির্জার এই পথচলা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একজন শিক্ষাবিদের ভূমিকা শুধু মঞ্চ বা বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর ভূমিকা শহরের পথঘাট, মানুষের সংগ্রাম এবং সংস্কৃতির মর্মে পৌঁছে যায়। দিল্লি ড. আমনা মির্জার মধ্যে শুধু একজন পণ্ডিত নয়, একজন বিবেকবান নাগরিক লাভ করেছে, যিনি এক হাতে বই আর অন্য হাতে আশা নিয়ে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন।